বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) সকালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসেছে। সংসদের প্রথম দিনের অধিবেশন ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ছিল ব্যাপক আগ্রহ ও প্রত্যাশা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রস্তাবে অধিবেশনের প্রথম কার্যক্রমে সভাপতির আসন গ্রহণ করেন কুমিল্লার কৃতি সন্তান ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশারফ হোসেন, এমপি। পরে পর্যায়ক্রমে স্পিকার হিসেবে মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ এবং ডেপুটি স্পিকার পদে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল নির্বাচিত হন।
এরপর বিএনপির প্রয়াত চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াসহ দেশি-বিদেশি বরেণ্য ব্যক্তিদের স্মরণে শোক প্রস্তাব আনা হয় এবং তার ওপর আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সংসদের প্রথম দিনের এই আনুষ্ঠানিকতা সংসদীয় রীতিনীতির প্রতি সম্মান প্রদর্শনেরই বহিঃপ্রকাশ।
দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী এরপর রাষ্ট্রপতির ভাষণ শুরু হওয়ার কথা ছিল। স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ রাষ্ট্রপতির ভাষণের ঘোষণা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সংসদীয় ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হওয়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও তাদের জোটের সংসদ সদস্যরা প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করে প্রতিবাদ জানান। রাষ্ট্রপতির ভাষণ অব্যাহত থাকলে তারা ওয়াকআউট করেন। ফলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেই বিরোধী দলের প্রথম ওয়াকআউটের ঘটনা ঘটে।
সংসদীয় রাজনীতিতে ওয়াকআউট একটি পরিচিত ও গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের পদ্ধতি। যখন বিরোধী দল মনে করে যে তাদের বক্তব্য বা আপত্তিকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না, তখন তারা প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে অধিবেশন বর্জন করে। মূলত কোনো একটি বা একাধিক ইস্যুর প্রতিবাদ জানিয়ে স্বেচ্ছায় সংসদ কক্ষ ত্যাগ করাকেই ওয়াকআউট বলা হয়।
তবে বিরোধী দলের এই ওয়াকআউট নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা আলোচনা রয়েছে। কারণ, যে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের ভাষণের সময় তারা ওয়াকআউট করলেন, তার কাছেই এর আগে এনসিপি প্রধান ও বর্তমান সংসদের চিফ হুইপ নাহিদুল ইসলাম নাহিদ উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, যদি শপথ গ্রহণে কোনো আপত্তি না থাকে, তাহলে রাষ্ট্রপতির ভাষণ শোনা নিয়ে আপত্তির বিষয়টি প্রশ্নের জন্ম দেয়। তবে সব মিলিয়ে প্রথম দিনের অধিবেশন গণতান্ত্রিক রীতিনীতির মধ্য দিয়েই সম্পন্ন হয়েছে বলেই মনে করা যায়।
অধিবেশনের প্রথম দিন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান এবং বিরোধীদলীয় নেতা ডা. মো. সফিকুর রহমান তাদের বক্তব্যে সংসদকে গণতান্ত্রিক আলোচনার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকারও তারা ব্যক্ত করেন।
বাস্তবে দেশের মানুষও সেটাই চায়। স্বাধীনতার ৫৪ বছরের ইতিহাসে বহু সংসদ গঠিত হলেও খুব কম ক্ষেত্রেই সংসদ তার পূর্ণ কার্যকারিতা দেখাতে পেরেছে। কখনো সরকারি দলের একঘেয়েমি ও একনায়কতান্ত্রিক মনোভাব, আবার কখনো বিরোধী দলের হঠকারী সিদ্ধান্ত সংসদকে কার্যত অকার্যকর করে তুলেছে। ফলে সংসদ অনেক সময়ই কার্যকর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের বদলে আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থেকেছে।
তবে এবারের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। গত ১৭ বছরের আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামল এবং ৫ আগস্টের আন্দোলনে প্রায় দেড় হাজার ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগ দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করেছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি রাজনৈতিক দলগুলো দায়িত্বশীল আচরণ করে, তাহলে সংসদ সত্যিকারের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে রূপ নিতে পারে।
নিঃসন্দেহে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলের নানা সমস্যা ও অব্যবস্থাপনার ফলে দেশের অর্থনীতি ও প্রশাসনিক কাঠামো যে সংকটে পড়েছে, তা থেকে উত্তরণ রাতারাতি সম্ভব নয়। দীর্ঘ সময়ের জটিলতা ও অব্যবস্থাপনার জঞ্জাল সহজে দূর হয় না। এর সঙ্গে বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতা বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল বনাম ইরান সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিকে প্রভাবিত করায় তার প্রভাব আমাদের দেশেও পড়ছে।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের এক মাসও পূর্ণ করেনি। তাই এই মুহূর্তে সরকারের সামগ্রিক মূল্যায়নের সময় এখনও আসেনি। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়ে জনমনে আশার সঞ্চার করেছেন। সরকারি ব্যয়ে কৃচ্ছ্রসাধন, শনিবার ছুটির দিনেও সরকারি দপ্তরে কাজের উদ্যোগ, অপ্রয়োজনীয় প্রটোকল কমিয়ে দেওয়া এসব সিদ্ধান্ত জনগণের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে ঈদের আগেই ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রম শুরু করা এবং খাল খনন কর্মসূচির সময়সূচি ঘোষণা করাও সরকারের কথার সঙ্গে কাজের সমন্বয়ের ইঙ্গিত দেয়। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে, তাহলে জনগণের আস্থা আরও দৃঢ় হবে।
দেশের মানুষ আজ একটি কার্যকর, দায়িত্বশীল এবং প্রাণবন্ত সংসদ দেখতে চায়। বিপুল ছাত্র-জনতার রক্তের বিনিময়ে যে সংসদের যাত্রা শুরু হয়েছে, তা যেন কোনোভাবেই ব্যর্থতার পথে না যায় এটাই জাতির প্রত্যাশা। কোনো অশুভ বা পরাজিত ফ্যাসিস্ট শক্তি যেন সংসদের গণতান্ত্রিক পরিবেশকে নষ্ট করার সুযোগ না পায়, সে বিষয়ে সকল রাজনৈতিক শক্তিকে সতর্ক থাকতে হবে।
একই সঙ্গে সরকারি দল ও বিরোধী দল উভয়কেই মনে রাখতে হবে যে সংসদ কেবল ক্ষমতার প্রদর্শনের জায়গা নয়; এটি জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলনের জায়গা। এখানে যুক্তি, তথ্য ও নীতি নির্ভর বিতর্কের মাধ্যমে জাতীয় সমস্যার সমাধান খোঁজা উচিত।
নতুন সংসদের কাছে তাই কিছু মৌলিক প্রত্যাশা রয়েছে। প্রথমত, সংসদে নিয়মিত ও গঠনমূলক বিতর্ক নিশ্চিত করতে হবে। বিরোধী দলের মতামতকে সম্মান জানিয়ে সংসদীয় কমিটিগুলোকে কার্যকর করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো নয়, বরং বিশেষজ্ঞ মতামত ও জনস্বার্থকে গুরুত্ব দিতে হবে। তৃতীয়ত, দুর্নীতি, সুশাসন এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠায় সংসদকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে একটি সহনশীল রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য মতভেদে, কিন্তু সেই মতভেদ যেন সংঘাতে নয় সংলাপে রূপ নেয়, সেটিই কাম্য।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ যদি এই দায়িত্বশীল পথ অনুসরণ করতে পারে, তাহলে হয়তো বহুদিনের প্রত্যাশিত একটি কার্যকর সংসদ এবং শক্তিশালী গণতান্ত্রিক কাঠামোর পথে বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থেই এগিয়ে যেতে পারবে।