দুর্গাপূজায় আনন্দ নেই দিলীপের পরিবারে

# কুমিল্লায় মণ্ডপের সামনে সহিংসতায় স্বামী নিহত, পাঁচ বছরেও বিচার নিয়ে শঙ্কা
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ৯ ঘন্টা আগে

কুমিল্লা নগরীর মনোহরপুরে কালীবাড়ি মন্দিরের সামনে ২০২১ সালের দুর্গাপূজার অষ্টমীতে সহিংসতায় প্রাণ হারান দিলীপ কুমার দাস (৬০)। এরপর থেকে দুর্গাপূজা এলেই স্বামী হারানোর দুঃসহ স্মৃতি তাড়া করে তাঁর স্ত্রী রুপা রানী দাসকে। অন্যদের ঘরে যখন পূজার আনন্দ, তখন স্বামী হত্যার বিচার না পাওয়ার কষ্ট নিয়ে দিন কাটছে তাঁর। তাঁদের দুই সন্তানও পড়াশোনার জন্য বিদেশে চলে গেছেন। একদিকে স্বামী হারানোর শোক, অন্যদিকে সন্তানদের দূরে থাকা—সব মিলিয়ে পূজার আনন্দ যেন হারিয়ে গেছে তাঁর পরিবারে।

২০২১ সালের ১৩ অক্টোবর দুর্গাপূজার অষ্টমীর দিন ভোরে কুমিল্লা নগরীর নানুয়াদিঘির পাড়ের একটি পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরিফ অবমাননার খবর ছড়িয়ে পড়লে কুমিল্লাসহ দেশের কয়েকটি জেলায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। কুমিল্লা, নোয়াখালী, চাঁদপুর ও ফেনীসহ বিভিন্ন স্থানে হামলা, ভাঙচুর ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। হিন্দুধর্মাবলম্বীদের বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, পূজামণ্ডপ ও মন্দিরে হামলা চালানো হয়। এসব ঘটনায় মোট ৫৪টি মামলা হয়। এর মধ্যে কুমিল্লার বিভিন্ন থানায় একটি হত্যা মামলাসহ ১২টি মামলা করা হয়।

কুমিল্লার ঘটনায় কোতোয়ালি মডেল থানায় আটটি, সদর দক্ষিণ মডেল থানায় দুটি এবং দেবিদ্বার ও দাউদকান্দি মডেল থানায় একটি করে মামলা হয়। ২০২২ ও ২০২৩ সালে সিআইডি ছয়টি, পিবিআই তিনটি এবং কোতোয়ালি থানা-পুলিশ দুটি মামলাসহ ১১টি মামলায় ২৫৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়। দেবিদ্বার থানার মামলাটিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে পিবিআই।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সিসি ক্যামেরার ফুটেজের সূত্র ধরে ঘটনার পরদিন কক্সবাজার থেকে ইকবাল হোসেনকে আটক করে পুলিশ। মণ্ডপে পবিত্র কোরআন রাখার ঘটনায় তাঁকে প্রধান আসামি করা হয়। এ ঘটনায় আলোচিত ইকবালের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন স্থানে মোট ৩০টি মামলা রয়েছে।

সিআইডির তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তাদের তদন্তাধীন ছয়টি মামলার মধ্যে মণ্ডপে পবিত্র কোরআন রাখার ঘটনায় ইকবালসহ পাঁচজনকে আসামি করে একটি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। অন্য মামলাগুলোতে ১০৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। পিবিআই কুমিল্লার পরিদর্শক বিপুল চন্দ্র বিশ্বাস জানান, মণ্ডপে পবিত্র কোরআন রেখে প্রথমে ফেসবুক লাইভে ঘটনাটি ছড়িয়ে দেন মামলার একমাত্র আসামি গোলাম মাওলা। তাঁর ভাষ্য, লাইভে স্পর্শকাতর বিষয়টি তুলে না ধরলে সহিংসতা হতো না। সহিংসতা ছড়ানোর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।

বিচার নিয়ে শঙ্কায় দিলীপের পরিবার :

কালীবাড়িতে হামলায় নিহত দিলীপ কুমার দাসের একমাত্র মেয়ে প্রিয়া রানী দাস ২০২৪ সালে শিক্ষার্থী ভিসায় অস্ট্রেলিয়ায় যান। গত রোববার বিকেলে মুঠোফোনে তিনি বলেন, ‘আমার বাবার রক্তাক্ত মরদেহ ও মাথার আঘাত আমি দেখেছি। এ আঘাত শুধু ইটের আঘাত নয়। ধারালো অস্ত্রেরও আঘাত ছিল। আমার মনে হয়, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনও ভালোভাবে আসেনি। কারা বাবার হত্যায় জড়িত, তা আজও জানা হলো না।’

বাবা হত্যার বিচার নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে প্রিয়া বলেন, তাঁদের পরিবার এখনো জানে না, প্রকৃত হত্যাকারীরা কারা। তাঁর একমাত্র ভাই পার্থ দাসও ডেনমার্কে রয়েছেন।

মামলার বাদী প্রিয়ার মা রুপা রানী দাস বলেন, ‘মামলার কী অবস্থা জানি না। পাঁচ মাস আগে একবার আদালতে গিয়েছিলাম। সাক্ষ্য নেওয়ার কথা ছিল। সেদিন আর সাক্ষ্য নেওয়া হয়নি।’

৩০ মামলায় আসামি ইকবাল :

কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগার সূত্রে জানা যায়, মণ্ডপে পবিত্র কোরআন রাখার ঘটনায় আলোচিত ইকবালের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা, ধর্ম অবমাননা ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ৩০টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে গাজীপুরের একটি ঘটনায় করা মামলায় ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনাল ২০২৩ সালের ২ মার্চ তাঁকে এক বছর চার মাসের কারাদণ্ড দেন।

কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার শাহ আলম খান বলেন, মামলায় হাজিরার প্রয়োজনেই ইকবালকে বিভিন্ন কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে তিনি কুমিল্লা কারাগারে রয়েছেন।

কুমিল্লা আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) কাইমুল হক রিংকু বলেন, মণ্ডপে হামলা ও সহিংসতার মামলাগুলোর অধিকাংশ আসামি পলাতক। এ কারণে কিছু মামলায় অভিযোগ গঠনেও দেরি হয়েছে। পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, মালপত্র ক্রোক ও পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশসহ আইনি প্রক্রিয়া চলছে। সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে বিচার শেষ করে রায় দিতে আরও সময় লাগতে পারে।

তিনি আরও জানান, প্রধান আসামি ইকবাল ছাড়া অন্য আসামিরা জামিনে রয়েছেন। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার ইকবালের জামিন আবেদনের শুনানি হলেও তাঁর জামিন হয়নি।