শাহাজাদা এমরান রচিত ‘নীলফামারী ও আমার দায়’ টিম অ্যাডভেঞ্চার: সাংবাদিকতার ভেতর ভ্রমণ

ধারাবাহিক সিরিজ: মূল পাণ্ডুলিপি থেকে-১
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ৪ ঘন্টা আগে

আমরা যারা টিম অ্যাডভেঞ্চার এর সদস্য, তারা কেবল ভ্রমণপিপাসু নই—আমরা সবাই পেশাদার সাংবাদিক। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, আমরা সবাই আমার হাউজ-টিম আওয়ার কুমিল্লা এবং টিম কুমিল্লার জমিন–এর সদস্য। সময়ের প্রয়োজনে আমাদের মধ্যে কেউ কেউ এখন সাবেক সদস্য হলেও, বন্ধুত্বের সুতো কখনোই আলগা হয়নি। কাজ বদলেছে, দায়িত্ব বদলেছে; কিš‘ সম্পর্ক, বিশ্বাস আর সহযাত্রা অটুট রয়েছে।
এই টিমের সদস্যরা হলেন, আমি নিজে শাহাজাদা এমরান,সৈয়দ আহমেদ লাভলু,জসিম চৌধুরী,তারিকুল ইসলাম তরুণ,এম হাসান,ফরহাদ হোসেন ভূঁইয়া,শামছুল আলম রাজন এবং মজিবুর রহমান মুকুল।
সব ট্যুরে সবাই একসঙ্গে যাই এমন নয়। যার যার সুযোগ ও সুবিধা অনুযায়ী একেক ট্যুরে একেক জন যুক্ত হয়। তবে টিম লিডার হিসেবে আমি নিয়মিতই সহযাত্রী থাকি। এই টিম নিয়ে ইতিমধ্যে আমরা ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যসহ দেশের প্রায় ১৫ থেকে ২০টি জেলা বিভিন্ন সময়ে ভ্রমণ করেছি।
আমাদের ভ্রমণের একটি নিজস্ব রীতি আছে। গাড়িতে ওঠার আগেই ফেসবুকে জানিয়ে দিই,“আল্লাহর নামে রওনা হলাম …. জেলায়।” আর নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে সেখানকার কোনো ঐতিহাসিক ¯’াপনার সামনে দাঁড়িয়ে ছবিসহ ফেসবুকে জানিয়ে দেই “শুভ সকাল … জেলা।”
এই ভ্রমণগুলো কেবল ঘোরাঘুরি নয়; প্রতিটি সফরেই আমরা আমাদের দায়িত্ব বহন করি। কারণ আমরা সাংবাদিক। তাই যেখানেই যাই, সাংবাদিকতাকে সঙ্গে নিয়েই যাই। প্রতিটি ট্যুরে আমরা নিয়মিত ‘কুমিল্লার জমিন’ এ একাধিক লাইভ অনুষ্ঠান করি। সংশ্লিষ্ট জেলার প্রকৃতি, ইতিহাস, জনজীবন, সম্ভাবনা ও সমস্যার দিকগুলো তুলে ধরি সরাসরি সম্প্রচারে।
এই কারণেই আমাদের ভ্রমণ আর দশটা ট্যুরের মতো নয়। এটি আনন্দের, আবার দায়িত্বেরও। ক্যামেরার লেন্সে আমরা কেবল দৃশ্য ধারণ করি না, আমরা সময়, সমাজ ও মানুষের কথা তুলে আনি। ফলত ‘কুমিল্লার জমিন’-এর দর্শকরাও আমাদের এই অনুষ্ঠানগুলোকে ইতিবাচকভাবেই গ্রহণ করতে শুরু করেছেন।
আমাদের কাছে ভ্রমণ মানে শুধু পথ বদল নয়, দৃষ্টিভঙ্গির বিস্তার। আর টিম অ্যাডভেঞ্চার মানে সাংবাদিকতার ভেতর দিয়ে দেশকে জানা, মানুষকে ছোঁয়া এবং দায়িত্বকে সঙ্গে নিয়েই পথচলা।
পঞ্চগড়ের স্বপ্ন ও যাত্রার শুরু :
ছোটবেলা থেকেই একটি স্লোগান কানে ঢুকে গেছে
“টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া, সবাই বলে শহীদ জিয়া।”
বিএনপির নেতাকর্মীদের মুখে মুখে ঘুরে বেড়ানো এই স্লোগানটি আমার শৈশব, কৈশোর এবং রাজনৈতিক সচেতনতার সঙ্গে অদ্ভুতভাবে জড়িয়ে আছে। তখন হয়তো এর ভৌগোলিক বিস্তৃতি পুরোপুরি বুঝতাম না, কিš‘ শব্দগুলো কল্পনার ভেতর এক ধরনের মানচিত্র এঁকে দিত। টেকনাফ আর তেতুলিয়া দেশের দুই প্রান্ত। একটি দক্ষিণের শেষ সীমা, অন্যটি উত্তরের শেষ সীমানা। এই দুই নাম যেন বাংলাদেশের শুরু ও শেষের প্রতীক হয়ে উঠেছিল আমার কাছে।
সেই সময় থেকেই আমার ভেতরে জন্ম নেয় এক ধরনের স্বপ্ন- একদিন টেকনাফে যাব, একদিন তেতুলিয়ায় যাব। দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত ছুঁয়ে দেখব। নিজের চোখে দেখব সেই ভূগোল, যাকে আমরা স্লোগানে পরিণত করেছি।
জীবনের পথে হাঁটতে হাঁটতে সাংবাদিকতা আমাকে দেশের বহু জায়গায় নিয়ে গেছে। এ পর্যন্ত প্রায় ৩০ থেকে ৩৫টি জেলা ঘুরে দেখেছি কখনো কাজের প্রয়োজনে, কখনো নিছক ভ্রমণের টানে। অথচ আশ্চর্যজনকভাবে এই দুই স্বপ্নের জায়গা টেকনাফ আর তেতুলিয়া এখনো অধরাই রয়ে গেছে। যতবারই দেশের মানচিত্র দেখি, ততবারই মনে হয়, উত্তর আর দক্ষিণের এই দুই প্রান্ত আমাকে নীরবে ডাকছে।
২০২৫ সালের কোরবানির ঈদের পরদিন পরিবারের সবাইকে নিয়ে পঞ্চগড় যাওয়ার একটি সিদ্ধান্ত প্রায় চূড়ান্তই হয়ে গিয়েছিল। মনে হ”িছল, এবার অন্তত তেতুলিয়ার খুব কাছাকাছি পৌঁছানো যাবে। পরিবার নিয়ে যাওয়া মানেই আলাদা এক আনন্দ স্মৃতি, স্বস্তি আর ভালোবাসার ভ্রমণ। কিš‘ বাস্তবতা সব সময় স্বপ্নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে না।
আমার ছেলে শাহাজালাল সরকার আবীরের এইচএসসি পরীক্ষার বিষয়টি সামনে এলো। জীবনসঙ্গী খুব বাস্তব ও দৃঢ় কণ্ঠে বলল,“এখন না যাই। আবীরের পরীক্ষা শেষ হোক।”
কথাটা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ ছিল না। একজন বাবা হিসেবে সেটাই হওয়া উচিত। ফলে পারিবারিকভাবে সেই যাত্রা আর হয়ে উঠল না। সিদ্ধান্ত ¯’গিত হলো, কিš‘ স্বপ্ন থামল না। পঞ্চগড়ের নামটা তখন থেকেই আমার মাথার ভেতর ঘুরতে থাকল। যেন জায়গাটা আমাকে টানছে। যেন সেখানে না গেলে দায় থেকে যাবে।
এই দায়বোধই হয়তো আমাকে আবার সাংবাদিকতার জায়গায় ফিরিয়ে আনল। মনে হলো , পরিবার না হোক, সহকর্মীদের নিয়ে যাই। ক্যামেরা, মাইক্রোফোন আর দায়িত্ব নিয়ে যাই।

জুন মাসের তৃতীয় সপ্তাহে সাংবাদিক তারিকুল ইসলাম তরুণকে বললাম, “চল, পঞ্চগড় যাই।” কোনো বাড়তি নাটক নেই, কোনো জাঁকজমকপূর্ণ পরিকল্পনা নয়,একটা সরল প্রস্তাব। কিš‘ তরুণের চোখেও আমি একই আগ্রহ দেখলাম। সিদ্ধান্ত নিতে খুব বেশি সময় লাগল না। ঠিক হলো, ২৬ জুন ২০২৫, বৃহস্পতিবার।
আমাদের দীর্ঘদিনের একটি স্বপ্ন ছিল পঞ্চগড় জেলার তেতুলিয়া উপজেলা, অর্থাৎ বাংলাদেশের সর্বশেষ উত্তর সীমান্তটি দেখা। কিš‘ এই সফরে নানা ব্যস্ততার কারণে সাংবাদিক তারিকুল ইসলাম তরুণ ছাড়া আর কেউ সঙ্গী হতে রাজি হননি। শেষ পর্যন্ত আমরা দু’জনই যাত্রার সিদ্ধান্তে অটল থাকলাম।
২৬ জুন ২০২৫, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত প্রায় ১১টার দিকে আমরা কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার হোটেল নূরজাহান-এ পৌঁছাই। গিয়ে দেখি পঞ্চগড়গামী সব বাস ইতোমধ্যে ছেড়ে গেছে। মুহূর্তের মধ্যে হতাশা গ্রাস করল। এত দূরের যাত্রা, আর শুরুতেই অনিশ্চয়তা!
খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে পাওয়া গেল বান্দরবান টু পঞ্চগড়গামী ‘তয়েজ এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি বাস। কিছুটা স্বস্তি ফিরে এলো। জনপ্রতি ৭০০ টাকা করে মোট ১৪০০ টাকায় দুটি টিকিট কেটে গাড়ির অপেক্ষায় রইলাম।
অবশেষে রাত পৌনে ১টার দিকে হোটেল নূরজাহান থেকে বাসটি ছেড়ে দিল। গাড়ি ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমি ফেসবুকে তিনটি ছবি দিয়ে একটি স্ট্যাটাস দিলাম
“কাঞ্চনজঙ্ঘা খ্যাত পঞ্চগড়ের উদ্দেশ্যে সাংবাদিক তরুণকে সঙ্গে নিয়ে কুমিল্লা নূরজাহান থেকে এখন রওনা হলাম। দোয়া করবেন সবাই। কাল চোখ রাখবেন ‘কুমিল্লার জমিন’-এ।”২৭.০৬.২০২৫
সেই মুহূর্তে আমি বুঝতে পারছিলাম না এই যাত্রা কেবল একটি জেলা ভ্রমণ নয়। এটি আমার বহুদিনের লালিত স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যাওয়া এক ব্যক্তিগত অভিযান। টেকনাফ- তেতুলিয়ার স্লোগান থেকে জন্ম নেওয়া এক গভীর দায়ের পথে যাত্রা।
আর এই যাত্রাই ধীরে ধীরে আমাকে নিয়ে যাবে নীলফামারীর সেই শ্বাসরুদ্ধকর ৩১ ঘণ্টার অভিজ্ঞতার দিকে,যার দায় আমি আজও বয়ে বেড়া”িছ। চলবে