পাখির আপন ঠিকানা কুমিল্লার হোসেনপুর

স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ৭ ঘন্টা আগে

কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার হোসেনপুর গ্রামে পাখিগুলো খুঁজে পেয়েছে আপন ঠিকানা। গ্রামটিতে বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতেই চারপাশের বাতাসে ভেসে আসে ডানা ঝাপটানোর শব্দ আর শত শত পাখির কলকাকলি। দূরদূরান্ত থেকে নিজেদের সাময়িক নীড়ে ফিরছে নানা প্রজাতির হাজার হাজার পাখি। শুভ্র বকের দল, পানকৌড়ি, শালিক, চড়ুই কিংবা টিয়া-বৃক্ষরাজির ডালপালাজুড়ে তারা মেতে উঠেছে সুরের মেলবন্ধনে, মেতেছে খুনশুটিতে। কোনো কৃত্রিম কিংবা সরকারি সীমানা নয়, গ্রামবাসীর অপরিসীম ভালোবাসা ও সুরক্ষায় সেখানে গড়ে উঠেছে এক অনন্য পাখির অভয়ারণ্য।

সরেজমিন দেখা যায়, কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার ছায়া সুনিবিড় গ্রাম হোসেনপুর। সাত বছর ধরে গ্রামটি হাজারো পাখির নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। গ্রামের উঁচু গাছপালার ডালে ডালে এখন পাখির রাজ্য। কাকডাকা ভোরে দলবেঁধে এগুলো খাবারের সন্ধানে ডানা মেলে দূর-অদূরে, আবার দিনের আলো নিভে আসার আগেই শত শত পাখির নিরাপদ প্রত্যাবর্তন ঘটে এই হোসেনপুর গ্রামেই। পুরো রাত নির্বিঘ্নে কাটিয়ে ভোর হতেই আবার শুরু হয় ওদের চঞ্চল ডানা ঝাপটানি।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পাখির প্রতি এই গ্রামের মানুষের রয়েছে এক গভীর মায়া ও নিবিড় মমত্ববোধ। সাত বছরে গ্রামবাসী ও পাখিগুলোর মধ্যে গড়ে উঠেছে আত্মিক সম্পর্ক। পাখিরা গ্রামটিকে নিজেদের নিরাপদ আবাসস্থল বেছে নিয়েছে, আর গ্রামবাসীও বুকে আগলে রাখছেন ওদের। পাখির ক্ষতি যেন কেউ না করতে পারে কিংবা শিকারির হাত থেকে পাখি যেন নিরাপদ থাকে, সে বিষয়ে গ্রামের শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই অত্যন্ত সোচ্চার।

গ্রামের এমন চোখজুড়ানো দৃশ্য ও পাখির কলকাকলি উপভোগ করতে প্রতিনিয়ত দূরদূরান্ত থেকে ভিড় করছেন নানা বয়সি দর্শনার্থী। কোলাহলমুক্ত এই নিভৃত পল্লিতে পাখির এমন অবাধ বিচরণ দেখে মুগ্ধ তারা। পরিবেশ সচেতন ও বিশেষজ্ঞদের মতে, হোসেনপুরের এই রূপ ধরে রাখতে হলে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কুমিল্লা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ হুমায়ূন কবির মাসউদ বলেন, পাখির এই অভয়ারণ্য টিকিয়ে রাখতে প্রথমত গাছপালা সংরক্ষণ ও রক্ষা করতে হবে। পাশাপাশি পাখি শিকার পুরোপুরি রোধ করতে স্থানীয়দের সমন্বয়ে একটি সচেতনতামূলক কমিটি গঠন করা জরুরি। নিরাপত্তা ও ভালোবাসার টানেই কেবল মানুষ নয়, অবলা প্রাণীও এক জায়গায় ভিড় জমায়। হোসেনপুর গ্রামের মানুষ যে ভালোবাসায় পাখিগুলোকে আগলে রেখেছেন, তাতে স্পষ্ট যে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এই গভীর বন্ধুত্বই গ্রামটিকে এনে দিয়েছে এক অনন্য পরিচয়।

হোসেনপুর গ্রামের বাসিন্দা আবুল হোসেন বলেন, আমরা পাখিগুলোকে বিরক্ত করি না। এখানে কেউ পাখি শিকার করতে পারে না। তাই অতিথি পাখি আমাদের গ্রামকে নিরাপদ আশ্রয় মনে করে। একই গ্রামের কলেজছাত্র ইমরান আহমেদ বলেন, পাখির কলকাকলিতে আমাদের গ্রামটি মুখরিত থাকে। এখানে পাখি শিকার নিষিদ্ধ। পাখির আগমনে গ্রামের পরিবেশ অনেক সুন্দর হয়েছে। দূরদূরান্ত থেকে পাখি দেখতে উৎসুক জনতা ছুটে আসে।

সদর দক্ষিণ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুজন চন্দ্র রায় বলেন, হোসেনপুর গ্রামের পাখি সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেব। পাখি যেন কেউ শিকার করতে না পারে, সে বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।