শাহাজাদা এমরান রচিত ‘নীলফামারী ও আমার দায়’ নীলফামারীতে শ্বাসরুদ্ধকর ৩১ ঘণ্টার সূচনা (হ্যান্ডকাফের আগমুহূর্ত)

ধারাবাহিক সিরিজ, মূল পাণ্ডুলিপি থেকে-৫
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ১ ঘন্টা আগে

সহকর্মী সাংবাদিক তরুণ নামাজ শেষ করতেই আমি স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললাম,
“চল, আল্লাহর নামে বের হই।”
ভ্রমণের ক্লান্তি তখনও শরীরে লেগে আছে, কিন্তু মনটা ছিল ফেরা-পথের হিসাবেই। ব্যাগ গোছানো, সময় মিলিয়ে নেওয়া, বাসের কথা সবই ছিল পরিচিত এক রুটিনের ভেতরে। হোটেল নূরের রুমের দরজাটা তখনও খোলা। হয়তো তাড়াহুড়োর কারণেই, হয়তো ভেতরের অদ্ভুত এক অস্থিরতায় দরজা বন্ধ করার কথাটা মাথায় আসেনি। আমি ব্যাগটা হাতে নেব ঠিক সেই মুহূর্তে ঘটনা ঘটল।
হঠাৎ করেই নীলফামারী জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) একটি চৌকস দল আমাদের রুমে ঢুকে পড়ল। কোনো নক নেই, কোনো পূর্বসংকেত নেই। নেতৃত্বে ছিলেন ডিবির সেকেন্ড অফিসার মো. জাকির হোসেন। মুহূর্তের মধ্যে রুমের বাতাস ভারী হয়ে গেল। শব্দ যেন থমকে দাঁড়াল। সময় যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্থির হয়ে গেল।
প্রথম প্রতিক্রিয়ায় আমি ভেবেছিলাম হয়তো ভুলবশত অন্য কোনো রুম ভেবে ঢুকে পড়েছে। শান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলাম,
“কারে চান?”
উত্তর এল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু তীক্ষ্ম
“শাহাজাদা এমরান – কে।”
এক মুহূর্তের জন্য বুকের ভেতর কেমন একটা কাঁপুনি খেলল। তবুও স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে বললাম,
“আমি।”
এরপর শুরু হলো প্রশ্নোত্তরের সেই পর্ব, যার প্রতিটি শব্দ আমার জীবনের গতিপথ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। আমি তখনও তা পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি।
ডিবি অফিসার জিজ্ঞেস করলেন,
“আপনি কি এমপি সীমাকে চিনেন ?”
বললাম,
“চিনি।”
পরের প্রশ্ন,
“এমপি বাহারকে ?”
বললাম,
“চিনি।”
এই দুটি নাম উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বুঝতে পারলাম এটি আর কোনো সাধারণ জিজ্ঞাসাবাদ নয়। বিষয়টি অনেক দূর গড়িয়েছে। অফিসার জাকির হোসেন সঙ্গে সঙ্গেই ফোন বের করলেন। ওপাশে ছিলেন একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার।
আমি স্পষ্ট শুনতে পেলাম, তিনি বলছেন
“স্যার, ইনফরমেশন সঠিক।”
ফোনের অপর প্রান্ত থেকে নির্দেশ এলো,
“অফিসে নিয়ে আসো।”
এই কয়েকটি শব্দ যেন বজ্রপাতের মতো আমার মাথার ভেতর আঘাত করল। সাংবাদিক হিসেবে গত তিন দশক বহুবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম দেখেছি, রিপোর্ট করেছি, বিশ্লেষণ করেছি। কিন্তু সেই মুহূর্তে আমি আর পর্যবেক্ষক নই আমি নিজেই হয়ে উঠলাম ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু।
তরুণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে। তার চোখে বিস্ময়, ভয় আর অনিশ্চয়তার ছায়া। আমার নিজের ভেতরেও তখন নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে কেন? কী কারণে? কোন অভিযোগে? কোন তথ্যের ভিত্তিতে আমাদের আটক করতে এসেছে ?

কিন্তু প্রশ্ন করার সুযোগ তখন আর আমার হাতে নেই। দৃশ্যপট দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কয়েক মিনিট আগেও যে রুমে আমরা কুমিল্লায় ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, সেই রুমই এখন আমার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ ৩১ ঘণ্টার প্রবেশদ্বার হয়ে দাঁড়াল।
আমি তখনও জানতাম না এই মুহূর্ত থেকেই শুরু হয়ে গেছে নীলফামারীতে আমার শ্বাসরুদ্ধকর জীবন। হ্যান্ডকাফ তখনও হাতে পরেনি, কিন্তু অদৃশ্য এক শিকল আমার চারপাশে জড়িয়ে গেছে। স্বাধীন চলাচলের জায়গা থেকে আমি ধীরে ধীরে প্রবেশ করছি এক অচেনা বাস্তবতায় যেখানে সাংবাদিক পরিচয়, নাগরিক অধিকার আর মানবিক প্রশ্নগুলো একে একে পরীক্ষার মুখে পড়বে।
এই মুহূর্তটাই ছিল সেই সূচনা যেখান থেকে আর পেছনে ফেরার কোনো পথ ছিল না।
শ্বাসরুদ্ধকর মুহূর্ত : জীবনে প্রথম হ্যান্ডকাফ
রুম থেকে বের করে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে ঠিক সেই সময় ডিবির এসআই জাকির হঠাৎ বললেন,
“ভাই, একটু হ্যান্ডকাফটা পড়তে হবে।”
শব্দটা কানে যেতেই ভেতরের মানুষটা যেন জেগে উঠল। মুহূর্তের ভেতর মাথার রক্ত গরম হয়ে উঠল। আমি প্রায় হুংকারের মতো গর্জে উঠলাম, “কেন আমি হ্যান্ডকাফ পড়ব? আমি কি চোর, না ডাকাত, না খুনি?”
প্রশ্নটা শুধু রাগ থেকে নয়, আত্মসম্মান থেকে ছুটে এসেছিল। জীবনে বহু অন্যায় দেখেছি, প্রতিবাদ করেছি, লিখেছি, বলেছি কিন্তু নিজ হাতে কখনো হ্যান্ডকাফ পড়ার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না।
ডিবি এসআই জাকির সঙ্গে সঙ্গে ওয়্যারলেসে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফাইজুল মামুনের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। আমি শুধু শুনতে পেলাম,“স্যার, সে হ্যান্ডকাফ পড়তে চাচ্ছে না।”
ওপাশে কী কথা হলো, তা আমার কানে আসেনি। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই এসআই জাকিরের কণ্ঠের দৃঢ়তা নরম হয়ে এলো। তিনি বললেন,“এমরান ভাই, আপনি শুধু আমাদের সঙ্গে নিচে গাড়ি পর্যন্ত পড়েন। গাড়িতে উঠেই খুলে ফেলা হবে। স্যার অনুরোধ করেছেন। এটা বড় স্যারের (এসপি) নির্দেশ।”
এক মুহূর্ত চুপ করে রইলাম। মনে হলো, এই মুহূর্তে না পরলে হয়তো পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। গভীর শ্বাস নিয়ে বললাম,
“ঠিক আছে।”
এরপর আমার হাতে, আর সহকর্মী সাংবাদিক তরিকুল ইসলাম তরুণের হাতেও হ্যান্ডকাফ পরানো হলো।
আমি যেমন তরুণকে চিনি, তার চেয়েও বেশি চিনি নিজেকে। নিজের ইতিহাস, নিজের অবস্থান, নিজের লড়াই। হোটেলের সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় মনে হলো, চোখের সামনে যেন একটি প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রীয় কাঠামোর হাতে আজ আমি হ্যান্ডকাফ পরা এক মানুষ। সেই হ্যান্ডকাফের ভেতরে যেন ঢুকরে কাঁদছে লাল-সবুজের পতাকা। যে পতাকার ভেতর মিশে আছে ৩০ লক্ষ শহীদের রক্ত, দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম।
আমার মনে হচ্ছিল, রংপুরের শহীদ আবু সাঈদ কিংবা ঢাকার শহীদ মুগ্ধ , তারা যেন বুক চাপড়ে কাঁদছে আর বলছে,
“ওরে পুলিশ, তোরা আর কবে মানুষ হবি?”
আমার কানে যেন বেজে উঠছিল, শহীদ আবু সাঈদ কিংবা শহীদ মুগ্ধ’র কন্ঠস্বর, ‘ এই শাহাজাদা এমরান, যে গত সতেরো বছর ধরে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী শাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে গণমাধ্যমের সামনে থেকে লড়াই করেছে; ঢাকার বাইরে দেশের ৬৩টি জেলার আঞ্চলিক গণমাধ্যমে যার মতো স্পষ্ট ও নিরবচ্ছিন্ন ভূমিকা খুব কমই দেখা গেছে, যে কিনা বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন নিয়ে বই লিখে আমাদের ২৪’কে আগামী প্রজন্মের কাছে সতেজ জীবন্ত রেখেছে । আজ সেই মানুষটির হাতেই হ্যান্ডকাফ পরালা।তোমরা পুলিশই রইলা আর মানুষ হইলা না ’।
মনে হচ্ছিল, ২০২৪-এর জুলাই আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের হাজারো যোদ্ধার কণ্ঠ একসঙ্গে গর্জে উঠছে-
“ওরে পুলিশ, তোরা কাকে হাতকড়া পড়াচ্ছিস?”
যে মানুষটি ঝুঁকি জেনেও জুলাই আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে দৈনিক আমাদের কুমিল্লা ও কুমিল্লার জমিন এর মাধ্যমে শুধু সামনে থেকে যুদ্ধই করেনি, বরং ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে জুলাই যোদ্ধাদের নিয়ে লিখেছে
‘আঙ্কেল গেইটটা খোলেন না : গণঅভ্যুত্থান কুমিল্লা–২০২৪’। এই একটি গ্রন্থ, যা এই গণঅভ্যুত্থানকে আগামী প্রজন্মের স্মৃতিতে জীবন্ত করে রাখবে।
হ্যান্ডকাফ পরা অবস্থায় যখন আমাদের গাড়িতে তোলা হলো, তখন লক্ষ্য করলাম, আমাদের দু’জনকে ধরতে পুলিশের তিনটি গাড়ি এবং ডিবি পুলিশের চার-পাঁচটি মোটরসাইকেল সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে। দৃশ্যটা দেখে আবারও আমার কল্পনায় ভেসে উঠল ২০২৪-এর বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের দিনগুলো। সেই আন্দোলনে আমি শুধু কলম ধরিনি,আমার চ্যানেলে একের পর এক লাইভ সম্প্রচার করেছি। আন্দোলন শেষের পর লিখেছি , পুলিশকে আস্থায় নিয়ে কাজ শুরু করার জন্য। বলেছি, পুলিশ বিভাগকে ঢেলে সাজানোর জন্য। চিৎকার করে টকশোতে বলেছি, সব পুলিশ হাসিনার দোসর না। সবাই খারাপ না। পুলিশকে সহযোগিতা করা আমাদের সবার দায়িত্ব। কারণ, পুলিশ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা ঠিক রাখা সম্ভব না।
আর আজ, সেই আন্দোলনের পরের সময়ে এসে এই পুলিশই, কোনো কারণ ব্যাখ্যা না করে, কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই, আমার হাতে হ্যান্ডকাফ পরাচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছিলাম এই ভেবে,শুধু আমি নই, আমার প্রয়াত বাবা, এমনকি আমার প্রয়াত দাদার বিরুদ্ধেও জীবদ্দশায় কোনো দিন থানায় একটি জিডি পর্যন্ত হয়নি। সেই পরিবারের একজন সন্তান আজ রাষ্ট্রের চোখে এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে,হাতকড়া পরা এক অভিযুক্তের মতো।
সেই মুহূর্তে আমি বুঝে গিয়েছিলাম, এটি শুধু একটি গ্রেপ্তার নয়। এটি একটি সময়ের সাক্ষ্য, একটি রাষ্ট্রীয় চরিত্রের প্রতিচ্ছবি। আর এই হ্যান্ডকাফ এটি কেবল আমার হাতে নয়, এটি এক অদৃশ্য প্রশ্নচিহ্ন হয়ে জড়িয়ে আছে আমাদের গণতন্ত্রের হাতেও। ভঙ্গুর আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর হাতে এই হাতকড়া।
১১। অদৃশ্য শক্তিতে চাঙ্গা মনোবল :
হোটেলের সিঁড়ি পেরিয়ে গাড়ির দিকে নিয়ে যাওয়ার পুরো সময়টা জুড়েই সহকর্মী সাংবাদিক তরিকুল ইসলাম তরুণের চোখে জল টলমল করছিল। তার চোখের সেই জল যেন কেবল ব্যক্তিগত ভয় নয় । ওখানে ছিল অনিশ্চয়তা, অপমানের বোধ, আর অজানা আশঙ্কার ভার। তা দেখে আমি থমকে দাঁড়ালাম না, বরং আরও দৃঢ় কণ্ঠে বললাম “তরুণ, সাহস রাখো। আমার জানা মতে তুমি এমন কিছু করনি, যার জন্য তোমাকে আটকে রাখা যায় বা মামলা দেওয়া যায়। যদি আমাকে না জানিয়ে তুমি কিছু করে থাকো, এখনই বলো।”
আমার কথার উত্তরে সে আর চোখের জল ধরে রাখতে পারল না। কান্নায় ভাঙা কণ্ঠে বলল, “বস, আপনি আমার ব্যাপারে সবই জানেন। আমি কোনো অন্যায় করিনি।”
তার কথায় এক মুহূর্তের জন্য চারপাশের সমস্ত শব্দ যেন থেমে গেল। আমি তার কাঁধে হাত রেখে শান্ত স্বরে বললাম,
“তাহলে মনোবল শক্ত রাখো। দেখো, আমি কিন্তু ভয় পাচ্ছি না। শুধু বুঝতে পারছি না কোথা থেকে, কীভাবে, কেন এই পরিস্থিতি তৈরি হলো।”
এই কথাগুলো বলার সময় আমি নিজেও বিস্মিত হচ্ছিলাম। কারণ বাস্তবতা ছিল কঠিন, পরিস্থিতি ছিল অস্বস্তিকর, অথচ আমার ভেতরে কোথা থেকে যেন এক অদ্ভুত শক্তি সঞ্চার হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, ভয় নামের অনুভূতিটা আমার চারপাশে ঘোরাফেরা করলেও আমাকে স্পর্শ করতে পারছে না। হঠাৎ করেই আমার মনোবল অদৃশ্য এক শক্তিতে চাঙ্গা হয়ে উঠল।
হ্যান্ডকাফে আবদ্ধ হাত, পুলিশের গাড়ি, চারপাশের উত্তেজনা সবকিছুর মাঝেও মনে হচ্ছিল আমি একা নই। আমার সঙ্গে আছে দীর্ঘদিনের সংগ্রাম, আছে সত্যের প্রতি অবিচল বিশ্বাস, আছে সাংবাদিকতার দায়বদ্ধতা। সেই দায়বদ্ধতাই যেন আমাকে ভিতর থেকে বলছিল, “ভেঙে পড়ার সময় এখন নয়। ইতিহাস ভীরুদের মনে রাখে না।”
গাড়িতে ওঠার মুহূর্তে আমি আর তরুণ,দু’জনেই নীরব হয়ে গেলাম। তবে সে নীরবতা ছিল ভিন্ন ভিন্ন রকমের। তরুণের নীরবতায় ছিল অশ্রু আর আশঙ্কা, আর আমার নীরবতায় ছিল দৃঢ়তা,একজন সাংবাদিকের আত্মবিশ্বাস, যে জানে সত্য কখনো স্থায়ীভাবে পরাজিত হয় না।
সেই মুহূর্তে আমি উপলব্ধি করলাম মানুষকে সবচেয়ে বড় শক্তি দেয় তার মনোবল। আর সেই মনোবল কখনো কখনো দৃশ্যমান কোনো উৎস থেকে নয়, আসে অদৃশ্য এক বিশ্বাস থেকে যে বিশ্বাস মানুষকে সবচেয়ে অন্ধকার সময়েও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শেখায়।(চলবে)