শাহাজাদা এমরান রচিত ‘নীলফামারী ও আমার দায়’ নীলফামারী পুলিশ সুপার কার্যালয়ে হাজির : নীরবতার ভেতর প্রশ্ন

ধারাবাহিক সিরিজ, মূল পাণ্ডুলিপি থেকে-৬
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ৫ ঘন্টা আগে

হোটেল থেকে বের করে নেওয়ার পর খুব বেশি সময় লাগেনি। মাত্র দশ থেকে পনেরো মিনিটের মধ্যেই আমাদের বহনকারী গাড়িটি নীলফামারী পুলিশ সুপার কার্যালয়ের ভেতরে ঢুকে পড়ল। সন্ধ্যার আলো তখন ধীরে ধীরে গাঢ় হচ্ছে। দিনের কোল ঘেঁষে নেমে আসছে রাত। সেই রাতের অন্ধকারে ঢোকার আগেই আমরা পৌঁছে গেলাম এক অচেনা বাস্তবতায়।
আমাদের ডিবির একটি কক্ষে বসানো হলো। চারপাশে তাকিয়ে প্রথম যে বিষয়টি চোখে পড়ল, তা হলো,হোটেল থেকে শুরু করে এই ডিবি কক্ষ পর্যন্ত পুরো যাত্রাপথে এস আই জাকিরের নেতৃত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের আচরণ। অবাক করার মতোই ভদ্র, সংযত এবং মানবিক। কোথাও কোনো ধমক নেই, নেই অযথা রূঢ়তা, নেই অপমানসূচক শব্দ। বরং প্রয়োজনীয় কথাগুলো বলা হয়েছে নরম স্বরে, দায়িত্বশীল ভঙ্গিতে।
এই ভদ্র আচরণই যেন আমার মনে আরও বেশি প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছিল। যদি আমরা অপরাধী হই, তবে এই সৌজন্য কেন? আর যদি অপরাধী না হই, তবে কেন এই আটক, কেন এই হ্যান্ডকাফ, কেন এই নীরবতা? কেউ কিছু বলছে না। প্রশ্ন করলে উত্তর নেই। যেন আমরা দুইজন এমন এক শূন্যতায় বসে আছি, যেখানে শুধু দেয়াল আছে, মানুষ আছে কিন্তু ব্যাখ্যা নেই।
এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই হঠাৎ কানে ভেসে এলো মাগরিবের আজান। আজানের ধ্বনি যেন কংক্রিটের দেয়াল ভেদ করে সরাসরি হৃদয়ে এসে আঘাত করল। আমি আর তরুণ একে অপরের দিকে তাকালাম। কোনো কথা না বলেই বুঝে নিলাম নামাজ পড়ব। অনুমতি নিয়ে আমরা নামাজ আদায় করলাম। সেই নামাজ ছিল শুধু ফরজ আদায়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়; ছিল এক ধরনের আত্মিক আশ্রয়, যেখানে দাঁড়িয়ে মানুষ নিজের অসহায়তাকে আল্লাহর সামনে তুলে ধরে।
নামাজ শেষে ফিরে এসে দেখি পরিস্থিতি আগের মতোই স্থবির। এরই মধ্যে শ্যামলী বাস কাউন্টার থেকে একের পর এক ফোন আসতে শুরু করেছে। গাড়ি ছাড়ার সময় হয়ে যাচ্ছে এই বার্তা বারবার পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু আমাদের দু’জনেরই মোবাইল ফোন তখন পুলিশের হেফাজতে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, পুলিশ নিজেরাও ফোন রিসিভ করছে না, আবার আমাদের হাতেও ফোন দিচ্ছে না। ফলে সময় এগিয়ে যাচ্ছে, গাড়ি ছেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে, অথচ আমরা সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। বাইরের দুনিয়ায় তখন আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে নির্ধারিত যাত্রা, আর ভেতরে আমরা আটকে আছি অজানা এক প্রক্রিয়ার মধ্যে , যার শুরু আছে, কিন্তু শেষ কোথায়, তা কেউ জানে না। জানি না আমরাও।
সেই মুহূর্তে আমার মনে হচ্ছিল, স্বাধীনতা কখন যে মানুষের হাতছাড়া হয়ে যায়, মানুষ তা বুঝতেই পারে না। কখনো একটি হ্যান্ডকাফে, কখনো একটি বন্ধ ফোনে, কখনো আবার নিছক নীরবতার দেয়ালে ধাক্কা খেয়েই মানুষ উপলব্ধি করে সে আর নিজের সময়ের মালিক নেই।
১২। প্রথম ডিবি জিজ্ঞাসাবাদ: অজানা প্রশ্নের ছায়ায়
কিছুক্ষণ পর এসআই জাকিরের নির্দেশে আমাদের ওপর পরবর্তী পদক্ষেপ শুরু হলো “তাদের হ্যান্ডকাফ খুলে দাও।” এক কনস্টেবল হ্যান্ডকাফ খুলে দিল। এরপর চারজন ডিবি অফিসার আমার সামনে বসে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করল। আমার পাশে সহকর্মী সাংবাদিক তরিকুল ইসলাম তরুণ ছিল।
প্রথম প্রশ্নগুলো ছিল সরল, কিন্তু অর্থবহ “নীলফামারীতে কেন এলেন? উদ্দেশ্য কী? আওয়ামী লীগের কোনো সাংগঠনিক পদে ছিলেন কি? এমপি বাহার ও এমপি সীমার সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কী?” প্রথমবারের মতো আমি বুঝতে পারলাম, কেন আমাদের আটক করা হয়েছে।
পেছনে ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের ঘটনা। কুমিল্লার এক শ্রেণীর সাংবাদিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমার বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। সেই যাদের ইন্দনে আমাদের ধরে নিয়ে এসেছে, তাদের পরিচয় স্পষ্ট নয়। তবে দুইটি বিষয় আমার মন থেকে সরছে না।
প্রথমত, যারা আমার বিরুদ্ধে এমন জঘন্য অপকর্ম করেছে, তারা আমার পছন্দ নয়, আমি তাদের বিরুদ্ধে কখনো হিংসা বা ক্ষতি করার কোনো কাজ করি নি। তবুও তারা কেন এমন ভয়ঙ্কর, হীন কাজ করেছে? কেন আমার বিরুদ্ধে এত বড় ক্ষতি করতে চাচ্ছে?
দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তির এই যুগে নীলফামারী পুলিশ কেন ন্যূনতম হোমওয়ার্কও না করে আমাদের আটক করার মতো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিল? সাংবাদিকতার বাইরেও আমি কুমিল্লায় বসে জাতীয় চার-পাঁচটি সংগঠনের নেতৃত্ব দেই। আমার খোঁজ নেয়া বা আমার পরিচয় জানা তো দেশের যে কোনো জেলা থেকে অতি দ্রুত সম্ভব। তারপরও কেন পুলিশ এত অতিউৎসাহি হলো?
যাই হোক, আমি ডিবি অফিসারদের দেওয়া সব প্রশ্নের উত্তর দিলাম। লক্ষ্য করলাম, তারা সিরিয়াস মুডে নয়; আমার উত্তর শুনতেও আগ্রহ খুব বেশি নেই। তারা বুঝে গেছে, আমি নির্দোশ। ধারণা হলো, মোবাইল আগে থেকেই তাদের নিয়ন্ত্রণে। প্রযুক্তির সহায়তায় তারা নিশ্চিত হয়েছে, যারা আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও বানোয়াট তথ্য দিয়েছে, তাদের উদ্দেশ্য ও প্রকৃত অবস্থা বোঝা গেছে।
এরই মধ্যে ডিবি অফিসাররা আমাকে চা খাওয়ালো। রাতের অন্ধকার নেমে এসেছে। রাতের নিরবতায় এসে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এ.বি.এম. ফয়জুল ইসলাম ওরফে মামুন সাহেব ডিবি ওসির রুমে উপস্থিত হলেন। আমাদেরকে তার সামনে নিয়ে আসতে বললেন ।
সেই মুহূর্তে, আমি বুঝতে পারলাম, এই জিজ্ঞাসাবাদ কেবল প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ নয়। এটি ছিল এক ধরনের মানসিক পরীক্ষা, যেখানে নির্ভরতা, ধৈর্য ও নিজের শক্তি পরীক্ষা করা হচ্ছিল। আমি ভাবলাম, এই পরিস্থিতি যতই কঠিন হোক, সাংবাদিকতার নীতি, সততা ও সাহসের পথে দাঁড়ানো কখনো থামানো যাবে না।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের মুখোমুখি: সন্দেহ থেকে স্বস্তির সেতুবন্ধ
ডিবি কক্ষে প্রথম দফার জিজ্ঞাসাবাদ শেষ না হতেই আবার আমাদের দু’জনের হাতে হাতকড়া পরানো হলো। ধাতব শীতল স্পর্শ যেন মুহূর্তের মধ্যে মনে করিয়ে দিল ,আমরা পুলিশের হাতে বন্দি। নীরবে, বিনা প্রতিবাদে, আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো ডিবি ওসি আক্তার সাহেবের কক্ষে।যেখানে বসে আছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এ.বি.এম ফয়জুল ইসলাম, যিনি সবার কাছে ‘মামুন সাহেব’ নামেই বেশি পরিচিত। আমরা সালাম দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলাম।
তিনি কোনো কথা না বলে কয়েক সেকেন্ড গভীর দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। সেই দৃষ্টি ছিল না শাসনের, ছিল না সন্দেহের বরং ছিল বিশ্লেষণের। হঠাৎ করেই তিনি ডিবি সদস্যদের উদ্দেশে বললেন, “এই হাতকড়া খুলে দাও।”
মুহূর্তেই বাতাস বদলে গেল। হাতকড়া খুলে দেওয়া হলো। তিনি মৃদু হাসি দিয়ে বললেন,
“ভাই, কী খাবেন? চা খান?” বলেই চা ও বিস্কুটের অর্ডার দিলেন। এই আচরণে আমার মনে হলো, পুলিশ হয়তো তাদের ভুলটা বুঝতে শুরু করেছে। মনে মনে ভাবলাম, সম্ভবত এখনই আমাদের ছেড়ে দেওয়া হবে।
হাসিমুখে তিনি প্রশ্ন করলেন, “ভাই, নীলফামারী কেন আসলেন?”
আমি পুরো ঘটনার সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা দিলাম। এরই মধ্যে ডিবির হেফাজতে নেওয়া আমার মোবাইল ফোনটি তিনি নিজ হাতে ফিরিয়ে দিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই শ্যামলী বাস কাউন্টার থেকে আবার ফোন আসতে শুরু করল। আমি জানালাম,“স্যার, কাউন্টার থেকে ফোন দিচ্ছে।” তিনি শান্ত গলায় বললেন,
“এসপি স্যার আসবেন। একটু অপেক্ষা করেন। বাস চলে যাক। আমরা আপনাকে ঢাকার বাসে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করব।”
তার আন্তরিকতা, ভদ্রতা ও মানবিক আচরণ দেখে মনে হলো, ৫ আগস্টের আগের পুলিশ আর এখনকার পুলিশের মধ্যে সত্যিই কোনো পার্থক্য এসেছে। মনে মনে বললাম, আল্লাহর রহমতে হয়তো পুলিশ আবার মানুষের কাতারে ফিরছে।
আমি মোবাইল হাতে নিয়ে আমার ফেসবুক পোস্টটি তাকে দেখালাম ,পঞ্চগড় যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার স্ট্যাটাস। তিনি পোস্টটি পড়ে হেসে বললেন, “আপনি তো খুব মজার মানুষ!”
এই সময় জানতে পারলাম, তার অফিসিয়াল নাম এ.বি.এম ফয়জুল ইসলাম হলেও ডাকনাম মামুন। অবাক করে দিয়ে তিনি আমাকে বললেন, “স্যার না, আমাকে মামুন ভাই বলবেন।” ঠিক তখনই চট্টগ্রামগামী শ্যামলীর শেষ বাসটি ছাড়ার আগ মুহূর্তে আবার ফোন এলো। মামুন ভাই নিজেই মোবাইলটি আমার হাতে দিয়ে বললেন,
“বলে দেন, একটু দেরি হবে।” আমি বললাম, “পরে তো গাড়ি পাব না।” তিনি দৃঢ় স্বরে বললেন,
“এই ব্যবস্থা আমি করব।”
এই আত্মবিশ্বাসী আশ্বাসে আমি একধরনের নির্ভরতা অনুভব করলাম। এরই মধ্যে তিনি আমার কাজ, সাংবাদিকতার পরিধি ও পেশাগত অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলেন। সুযোগ পেয়ে আমি তাকে ‘আঙ্কেল, গেইটটা খোলেন না: গণঅভ্যুত্থান কুমিল্লা ২০২৪’ বইটি উপহার দিলাম।
বইটি হাতে নিয়ে তিনি থমকে গেলেন। চোখে-মুখে বিস্ময়। একবার বইয়ের দিকে তাকান, আবার আমার দিকে। বললেন, “এই বই কি আপনার লেখা?”
সহকর্মী তরুণ ফিসফিস করে বলল, “বস, উনি কি আপনাকে আগে থেকেই চিনতেন? মনে হয় আমাদের ছেড়ে দিবে।” আমি চোখের ভাষায় বললাম, আল্লাহ ভরসা।
আমার ধারণা তখন আরও দৃঢ় হলো, আমাকে আটকের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরই অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মামুন ভাই হয়তো প্রযুক্তিগত বা ব্যক্তিগত সূত্রে আমার বিষয়ে খোঁজ নিয়েছেন। এবং তিনি বুঝতে পেরেছেন, আমি কোনো নেতিবাচক চরিত্র নই, বরং দায়িত্বশীল সাংবাদিক।
আড্ডার ফাঁকেই এএসপি মামুন ভাই বললেন, “ভাই, চিন্তা করবেন না। আপনি আমাকে যা যা বলেছেন, ঠিক সেভাবেই এসপি স্যারকে বলবেন। আশা করি স্যার আপনাদের সসম্মানে ছেড়ে দেবেন। আপনার বিষয়ে স্যারের কাছে সম্ভবত ভুল তথ্য এসেছে।”
সাহস করে আমি প্রশ্ন করলাম, “ভুল তথ্য এলেই কি একজন সম্মানিত নাগরিককে এভাবে আটক করা যায়? নজরদারিতে রেখেও তো যাচাই করা যেত।” তিনি সঙ্গে সঙ্গে বললেন, “এমরান ভাই, আমাদের পুলিশ কি আপনার সঙ্গে কোনো মিসবিহেভ করেছে?” আমি বললাম, “না।”
এই উত্তরেই আমি বুঝে গেলাম,অভিযোগ আসার পর পুলিশ সুপার হয়তো মামুন ভাইকেই দায়িত্ব দিয়েছিলেন যাচাইয়ের। কিন্তু একদিকে যাচাই, অন্যদিকে পূর্বনির্ধারিত মাইন্ডসেট, এই দ্বন্দ্বের মাঝেই আমরা ডিবির হাতে চলে এসেছি। এই কথাগুলো মামুন ভাই আমাকে সরাসরি বলেননি। সম্মানিত পাঠক, ভুল বুঝবেন না। তার আচরণ, কথাবার্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই আমি তৃতীয় চোখে এই সত্যটুকু অনুধাবন করেছি।
সেই রাতে নীলফামারী পুলিশ সুপার কার্যালয়ের একটি কক্ষে বসে আমি বুঝেছিলাম,কখনো কখনো একজন মানুষের ভাগ্য নির্ধারিত হয় একটি ভুল তথ্য, আর একজন দায়িত্বশীল মানুষের বিবেক দিয়ে।( চলবে…)