মেঘনাপাড়ের জনপদ চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলা। এ উপজেলার লক্ষাধিক মানুষের একটি বড় অংশের জীবিকানির্ভর কৃষি ও মৎস্য আহরণের ওপর। তবে কৃষিনির্ভর এ জনপদে অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে পান চাষ।
বছরের পর বছর ধরে এখানকার কৃষকেরা পান চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। সবুজে ঘেরা পানের বরজ ঘিরে গড়ে উঠেছে কর্মসংস্থানের বিশাল ক্ষেত্র। বর্তমানে উপজেলায় ২৩৫ হেক্টর জমিতে পান চাষ হচ্ছে। বছরে এ উপজেলা থেকে প্রায় ৫২ কোটি টাকার পান বিক্রি হয়। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ পেশার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন ৫ থেকে ৬ হাজার মানুষ।
হাইমচর উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর উপজেলায় ২৩৫ হেক্টর জমিতে পানের আবাদ হয়েছে। বর্তমানে এখানে পানের বরজ রয়েছে ১ হাজার ৭২টি। এসব বরজকে কেন্দ্র করে প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে। পান চাষ, পরিচর্যা, সংগ্রহ, বাছাই, সাজানো, পরিবহন ও বিপণন সব মিলিয়ে স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এ কৃষিপণ্য।
উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের মধ্যে দুটি ইউনিয়নের অবস্থান মেঘনা নদীর পূর্ব পাড়ে। এসব এলাকার অধিকাংশ গ্রামেই রয়েছে পানের বরজ। একটি পানের লতা থেকে কয়েক দশক পর্যন্ত পান উৎপাদন করা সম্ভব হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি আয়ের আশায় অনেক কৃষক এ চাষে আগ্রহী হয়েছেন।
পানের লতা সুস্থ রাখতে নিয়মিত পরিচর্যার পাশাপাশি পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষায় কীটনাশক এবং ফলন বাড়াতে সার ও খৈল ব্যবহার করেন চাষিরা। শীত মৌসুমে উৎপাদন কিছুটা কমে এলেও বছরের অধিকাংশ সময়ই পান উৎপাদন স্বাভাবিক থাকে।
পান চাষে বছরের প্রায় প্রতিটি দিনই ব্যস্ত থাকতে হয় কৃষকদের। শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় অনেক চাষি নিজেরাই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বরজের পরিচর্যা করেন। হাটের দিনকে সামনে রেখে আগেই বরজ থেকে পান সংগ্রহ করে বাছাই ও সাজিয়ে রাখেন। এরপর প্রতি মঙ্গলবার এলাকার নির্ধারিত হাটে এসব পান বিক্রি করেন। পাশাপাশি প্রতিদিনই চলে পাইকারি পান কেনাবেচা। স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে এসব পান বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয়।
উত্তর আলগী ইউনিয়নের মহজমপুর গ্রামের পান চাষি ফারুকুল ইসলাম গাজী জানান, এ এলাকার অধিকাংশ মানুষই কোনো না কোনোভাবে পান চাষের সঙ্গে জড়িত। পান বিক্রির টাকা দিয়েই অনেক পরিবারের সংসার চলে। তবে বর্তমানে শ্রমিকের দৈনিক মজুরি অনেক বেশি।
অন্যদিকে পান চাষের প্রয়োজনীয় উপকরণও কিনতে হচ্ছে বাড়তি দামে। বর্তমানে এক বিড়া পান বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৫০ টাকায়। অথচ সাধারণ ক্রেতার হাতে পৌঁছাতে সেই পান কিনতে হচ্ছে দেড়শ টাকায়। মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে কৃষকেরা উৎপাদিত পানের ন্যায্যমূল্য থেকে অনেক সময় বঞ্চিত হচ্ছেন।
উপজেলার নয়ানী গ্রামের পান চাষি আলমগীর হোসেন জানান, পান উৎপাদনে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, শ্রমিকের উচ্চ মজুরি এবং বাজারজাতকরণে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কৃষকদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা, পান চাষে সরকারি সহযোগিতা বৃদ্ধি, সহজ শর্তে কৃষিঋণ প্রদান এবং বাজারব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে উৎপাদিত পানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা হবে।
হাইমচর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শাকিল খন্দকার জানান, বর্তমানে উপজেলায় পানের উৎপাদন খুবই ভালো। বাজারে পানের দামও ভালো থাকায় কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন। পান উৎপাদন বৃদ্ধি এবং রোগবালাই থেকে বরজ রক্ষায় কৃষকদের সব সময় সহযোগিতা ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। উৎপাদন ভালো হলে প্রতিবছর এ উপজেলা থেকে প্রায় ৫২ কোটি টাকার পান বিক্রি হয়ে থাকে।