‘ধরা খাওয়ার পর বেধরক মারধর করে মেরে ফেলবে, এমন সময় মিরাকল ভাবে বেঁচে যাই’

বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অণুগল্প -২৯
শাহাজাদা এমরান।।
প্রকাশ: ২ সপ্তাহ আগে

যুদ্ধের যাত্রা যখন শুরু :
বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মান্নান বলেন, ২৫ মার্চ রাতে আমরা দল বেধে পৃথক ভাবে সারা কুমিল্লা শহরেই মিছিল করি। এ সময় মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছেন অধ্যক্ষ আফজল খান,নাজমুল হাসান পাখিসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। রাত ১২টায় যখন আর্মিরা কুমিল্লা পুলিশ লাইন্স আক্রমন করে, তখন আমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যার যার মতো করে পালিয়ে যাই।
এরপর এপ্রিলের ২/৩ তারিখ হবে। আমার মা জাহেদা খাতুন, হঠাৎ ক্ষুদ্ধ কন্ঠে বলে উঠেন ‘‘চর্তুদিকে পাঞ্জাবীরা বাঙ্গালীদের মেরে ফেলছে। দেশের যুবক ছেলেরা দলে দলে যুদ্ধে যাচ্ছে। তুইও যা। পাঞ্জাবীদের মেরে প্রতিশোধ নে বাবা,দেশ স্বাধীন কর। যেদিন দেশ স্বাধীন হবে, সেই দিনই বাড়িতে আসবি-আমি তোর অপেক্ষায় থাকমু’’ মা’র কন্ঠে এই কথা গুলো শুনে আমার শরীর দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠল। মাকে সালাম করে পরদিন সকালে ভাতিজা রতনকে নিয়ে সীমান্ত পার হয়ে চলে এলাম ভারতের সোনাইমুড়ির ছদু ফকিরের বাড়ি। ২ দিন পর অবার দেশে চলে আসি।

প্রশিক্ষণ যখন শুরু :
এপ্রিলে প্রথম সপ্তাহে আমাদের এলাকার মফিজ,রতন,জাহাঙ্গীরসহ আমরা ৫/৬জন মিলে ভারতের সোনামুড়া যাই কৌতুহলবশত।সেখানে গিয়ে আমরা মহিলা কলেজের সামনে হাঁটাহাঁটি করছি এমন সময় পুলিশ এসে আমাদের ধরে থানায় নিয়ে যায়।থানায় আমাদের পরিচয় নিশ্চিত হয়ে সীমান্তে নিয়ে ছেড়ে দেয়। ভারতের সোনামুড়া এসে আমাদের এলাকার আওয়ামীলীগের বড় নেতা মোজাম্মেল হককে পাই। তিনি আমাদের কথা শুনে আমাকে হাতিমারা ও রতনকে কাঠালিয়া ক্যাম্পে পাঠিয়ে দিলেন। তখনো ভাল করে ক্যাম্পগুলো গড়ে উঠেনি। তাই আমাদের জঙ্গল পরিস্কার করে মশা মাছির কামড় খেয়ে রাত কাটাতে হয়েছে। এ সময় খাবারের সংকটও ছিল প্রচন্ড। খাবার পানির সংকট ছিল আরো বেশী। বৃষ্টির পানি হাতে নিয়ে খেয়ে কত যে ক্ষুধা নিবারণ করেছি তার কোন খবর নেই। বৃষ্টি এলে সে পানি সংগ্রহ করে রাখতাম খাওয়ার জন্য। এই ক্যাম্পে আমরা প্রায় হাজারের উপর যুবক প্রায় দুই মাস প্রশিক্ষন নেই। আমি অস্ত্র চালনার সাথে সাথে গুপ্তচোরবৃত্তিরও প্রশিক্ষন নেই। অর্থাৎ গোয়েন্দাদের মত এলাকায় এলাকায় ঘুরে ঘুরে খবর সংগ্রহ করে কেন্দ্রে জানানো ।

যুদ্ধের অনুপম গল্প :
প্রথম যুদ্ধ সম্পর্কে জানতে চাইলে বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মান্নান বলেন, আমি প্রথম যুদ্ধে অংশ নেই আদর্শ সদর উপজেলার তেলকুপি,বসন্তপুর,ভুবনঘরও পাহারপুর এলাকায়। এই যুদ্ধে আমাদের সাথে যারা ছিলেন তারা হলেন, গিয়াস খান,রতন,সুলতান আহমেদ,নাজিমসহ আরো অনেকে। আমাদের থানা কমান্ডার ছিলেন আবদুল মতিন।
দ্বিতীয় যুদ্ধ সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, শিবির বাজারে পাঞ্জাবীদের সাথে আমাদের একটি মারাত্মক যুদ্ধ হয়। সেই যুদ্ধে আমার হাতে ছিল থ্রি নট থ্রি রাইফেল।এখানে পাঞ্জাবীদের তীব্র আক্রমনের মুখে আমরা পিছু হটতে বাধ্য হই। আমরা পিছু হটে গেলে হানাদার বাহিনী এখানকার ২৮জন মানুষকে হত্যা করে। এরপর আরো কয়েকটি সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেয়ার পর আমাকে সোনামুড়া ক্যাম্পের নিরাপত্তা কমান্ডার বজলুর রহমানের সাথে ইন করা হয়। কিছুদিন যাওয়ার পর অনুভব করলাম সম্মুখ যুদ্ধের চেয়েও অনেক কঠিন এই কাজটি। কারণ,আমার কর্ম এলাকা ছিল কুমিল্লা শহর ও এর আশেপাশের এলাকা। আমার মূল কাজ হচ্ছে একেক দিন একেক রকম ছদ্মবেশ ধারণ করে হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের খোঁজ খবর দেওয়া। এই কাজ করতে গিয়ে বেশ কয়েকবার মৃত্যুর মুখে পড়েছি। মহান আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়ে এনেছেন। ধরা খেয়েছি,আটক করে রেখেছে,বেধরক মারধর করেছে। মেরে ফেলবে এমন সময় মিরাকল ভাবে বেঁচে এসেছি।

বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মান্নান বলেন, একদিন আমার দায়িত্ব ছিল কুমিল্লা শহরের চকবাজার,রাজগঞ্জ সংলগ্ন এলাকায়। ঐ দিন হঠাৎ করে আমাদের এলাকার রাজাকার ইসহাকের সাথে রাজগঞ্জ চৌমহনীতে দেখা হয়ে যায়। তার চোখের চাহনী দেখে আমি বুঝতে পারি সে আমাকে টার্গেট করেছে। আমি পালিয়ে যাব এমন সময়ই তারা আমাকে ধরে ফেলে। পরে বজ্রপুর ইউছুফ হাই স্কুল রোডের জোনাকী রেস্টুরেন্টের ভিতরে আমাকে আটকে রেখে অমানবিক নির্যাতন করে তালা দিয়ে রাখে। উদ্দেশ্য রাতে আমাকে পাক সেনাদের কাছে তুলে দিবে। সন্ধ্যার পর একটি ট্রাক আসে রেশমের মাল উঠানোর জন্য। কিন্তু তারা মাল উঠানোর জন্য কোন লোক পাচ্ছে না। তাদের কথা গুলো আমি শুনতে পাচ্ছিলাম। আমি তাদের বললাম,আমি মাল উঠিয়ে দিতে পারব। একথা বললে সাথে সাথে তারা রুম খুলে আমাকে বের করে নিয়ে আসে । তারা আমাকে চোখে চোখে রাখছিল। আমি অর্ধেক মাল উঠানোর পর সুযোগ বুঝে দিলাম এক দৌঁড় । ছাতিপট্রির দিকে এসে একটা রিক্সা পেলাম। রিক্্রা চালককে বললাম, ঝাকুনীপাড়া চল,জোড়ে চালাও,টাকা বেশী দিব। ঝাকুনীপাড়া যাওয়ার পথে দেখা দিল আরেক সমস্যা। চকবাজার পার হয়ে হয়ে ঝাকুনীপাড়া যেতে একটি মন্দির পড়ে। এই মন্দিরের সামনে ছিল আর্মি ক্যাম্প যা জগন্নাথপুর ক্যাম্প নামে পরিচিত ছিল। রিক্্রা জোড়ে চালাচ্ছে দেখে পাঞ্জাবীদের সন্দেহ হলো। ক্যাম্পের টহলরত সৈনিক রিক্সা থামিয়ে বলল,তুই মুক্তিসেনা। আমি বললাম না,আমি মুক্তি না। তখন বলল, তুই যে মুক্তি না তার প্রমান কি ? ভারতের সোনাপুর ক্যাম্পের কি যেন বাংলা লেখা একটা কাগজ আমার কাছে ছিল। যেহেতু তারা বাংলা পড়তে জানে না, তাই আমি ইচ্ছে করে বললাম ,এই দেখেন আমার কাগজ। আমি সাধারণ নাগরিক। তখন ধমক দিয়ে বলল, যা পেছনে তাকাবি না। পরে আমি এই রাতেই গোমতী নদী সাঁতরিয়ে সীমান্ত পার হয়ে সোনামুড়া যাই। ঐ রাতে আমি কল্পনাও করিনি বাঁচব। মহান আল্লাহ্ আমাকে মরাকল ভাবে সে রাতে বাঘের মুখ থেকে বাঁচিয়ে এনেছেন।

আরেক দিনের একটি স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, একদিন আমার ডিউটি ছিল চকবাজার। তখন চকবাজার পুলিশ ফাঁড়ির সাথে একটা বড় বট গাছ ছিল। অনেকক্ষন হেঁটে আমি বট গাছের নিচে গিয়ে একটু বসছি। এমন সময় কালা মিয়া নামক এক স্থানীয় লোক আমার পাশে গিয়ে বসে। সে বসার কারণে সন্দেহপ্রবণ হয়ে আমি সাথে সাথে উঠে যাই। যেই না আমি উঠে গেছি এমন সময় একটি বোমা এসে কালা মিয়ার উপর পড়ে আরেকটি বোম গিয়ে পড়ে আলীয়া মাদ্রাসা রোডস্থ সেলিম নামের এক চা দোকানদারের উপর। দুই জনেই ঘটনাস্থলে মারা যায়। পড়ে শুনেছি এই শক্তিশালী বোম দুটি নিক্ষেপ করেছে আমাদের মুক্তিবাহিনীর লোকেরা কালিকাপুর থেকে পুলিশ ফাঁড়ি লক্ষ্য করে। সে দিনের কথা মনে হলে আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না যে, কিভাবে আমি বেঁচে আছি। স্বয়ং আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়েছে।

যুদ্ধের বেদনাদায়ক একটি স্মৃতি বলতে গিয়ে আবদুল মান্নান বলেন, একদিন মা আমাকে দেখতে চাইলেন। রাজাকারদের ভয়ে নিজের বাড়ি না গিয়ে আরেক বাড়িতে গিয়ে মাকে খবর দেই। মা আমার জন্য ভাত নিয়ে আসেন। আমি ভাতের লোকমাটা মুখে দেব ,এমন সময় ঐ ঘরের চালের উপর একটা বোম এসে পড়ে।চালটি ছিদ্র হয়ে ঠিক আমার ভাতের প্লেটের মধ্যে এসে পড়ে। তখন ভাত ফেলে কিভাবে যে দৌঁড়ে পালিয়ে এলাম তা ভাবতেই এখন অবাক লাগে।

পরিচয় : মো: আবদুল মান্নান। পিতা ফজলুর রহমান এবং মাতা জাহেদা খাতুন। ১৯৪৬ সালে আদর্শ সদর উপজেলার পাঁচথুবি ইউনিয়নের জালুয়াপাড়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। পিতা-মাতার চার মেয়ে ও তিন ছেলের মধ্যে তার অবস্থান তৃতীয়।তিনি ১৯৭০ সালের শুরুতেই দৈনিক পাকিস্তানের মেশিন বিভাগে চাকুরী নেন। দৈনিক পাকিস্তানে চাকুরী করার সুবাধে দেশের নানা খবরাখবর তিনি সব সময়ই জানতেন। ২৫ ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে তিনি ছুটি নিয়ে বাড়ি আসেন।