শব্দদূষণ -ঘাতকরূপী সামাজিক সমস্যা

স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ৭ মাস আগে

শব্দদূষণ হচ্ছে একটি নীরব ঘাতক। বাংলাদেশ ছাড়া বিশে^র কোথাও যেখানে সেখানে বিশেষ পরিস্থিতি ছাড়া হর্ন বাজায় না। আমাদের দেশে মালবাহন নিয়ে কেউ রাস্তায় বেরুলেই রাস্তায় হর্ন বাজানো জরুরী বলে মনে করেন। কারণে-অকারণে হর্ন বাজানো একটা স্টাইল হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারকদের গাড়ীই হোক বা যাত্রীবাহী বাসই হোক কোনটাতেই কোন ব্যতিক্রম নাই। সবার আগে প্রয়োজন শব্দদূষণের বালাই থেকে মুক্তির জন্য মানসিকতার পরিবর্তন। যারা নিজে গাড়ী চালান তাঁদের সচেতন হওয়া দরকার। আর মালিকদের উচিত চালকদের হর্নের ব্যাপারে সতর্ক করে দেয়া। শব্দদূষণ বন্ধে যে আইন আছে তা বাস্তব প্রয়োগ করতে হবে। বাস্তব দৃষ্টিতে দেখলে বলা যায় সিটি কর্পোরেশন, ট্রাফিক পুলিশ ও পরিবেশ অধিদপ্তর চাইলেই শব্দদূষণ বন্ধ করা যায়।
উচ্চ মাত্রার শব্দ দূষণ মানুষের জীবনী শক্তিকে আস্তে আস্তে ক্ষয় করে। শুধু কানে কম শোনা বা এ জাতীয় সমস্যা নয়, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপরও এর এক বিরাট নেতিবাচক প্রভাব আছে। জার্মান এক গবেষকের গবেষনায় বলা হয়েছে, ঢাকা শহরের শব্দদূষণ মানুষকে অনেক আচরণ পাল্টে দিচ্ছে। অল্পেই মেজাজ খারাপ, সামান্য কারণেই ক্ষেপে যাওয়ার কারণগুলি শব্দদূষণ থেকে হচ্ছে বলেই গবেষকদের ধারণা। শব্দদূষণ যে জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর তা নীতি নির্ধারকরা মানতে নারাজ। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশে যে বিধিমালা জারি রয়েছে সেখানে বিস্তারিত বলা আছে, দিনের কোন সময়ে কোন এলাকায় কি রকম শব্দ মাত্রা থাকবে, এসব নিয়ম না মানলে জেল-জরিমানারও বিধান রয়েছে।
শব্দের অনুমোদিত মাত্রা যেখানে ৬০ ডেসিবল সেখানে সিটি কর্পোরেশনের অনেক আবাসিক এলাকায় তা ৮৪ থেকে ৯০ ডিসেবল পাওয়া গেছে। ট্রাফিক পুলিশদের মাঝে প্রায় ৩১ শতাংশ এবং রিক্সাচালকদের মাঝে ৪২ শতাংশ কানের সমস্যায় ভুগছেন। এছাড়া অটোরিকশা, মোটরসাইকেল, বাসের চালকেরা ও সড়কের আশপাশের বসবাসকারী পেশাজীবীদের অনেকেই কানের সমস্যায় ভুগছেন। হেলথ সাইন্সের গবেষণা প্রতিবেদনে শব্দদূষণ সমস্যা সমাধানে ৮ টি সুপারিশ করেছেন। এর মধ্যে রাস্তায় শব্দদূষণের উৎস চিহ্নিতকরণ, মাত্রা কমানোর পদক্ষেপ নেয়া, নিয়মিত শ্রবণ শক্তি পরীক্ষা ও রাজপথে কর্মজীবীদের কর্মঘন্টা কমানো জরুরী ব্যাপার। আমরা আশা করি এ প্রস্তাবনাসমূহ বাস্তবায়িত হবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব হেলথ সাইন্সের গবেষণায় সম্প্রতি শব্দদূষণের নেতিবাচক প্রভাবের যে চিত্র উঠে এসেছে তা সত্যিই ভয়াবহ। গবেষণায় দেখা যায় সড়কে কাজ করা পেশাজীবীরার ২৫% কানে কম শুনতে পায়। আর ৭ শতাংশ মানুষ এতই কম শুনেন যে তাদের শ্রবণ সহায়ক যন্ত্র ব্যবহার করতে হয়। ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি কর্পোরেশন, কুমিল্লা, সিলেট ও রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন এলাকার সড়কে কর্মরত পেশাজীবীদের নিয়ে এ গবেষণাকার্য পরিচালিত হয়। তাঁদের গড় বয়স ৩৮ বছর এবং সপ্তাহে ৬ দিন গড়ে ১১ ঘন্টা কাজ করতে হয় সড়কের আশেপাশে।
হর্ন না বাজিয়ে গাড়ি চালানো যায় সে ধারণা আমাদের চালকদের মাঝে অনুপস্থিত। বরঞ্চ সড়ক-মহাসড়ক থেকে অলিতে গলিতে কে কত জোড়ে, কত বেশিবার হর্ন বাজাতে পারেন সেই প্রতিযোগীতায়ই সবাই ব্যস্ত, ফলাফল হলো জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচীর জরিপে ঢাকা বিশে^র সবচেয়ে বেশি শব্দদূষণের নগরী। এ অভিশাপ থেকে অন্য নগর ও শহরবাসীগণও নিরাপদ নহেন। শব্দদূষণের ক্ষতিকর দিক নিয়ে নানা সময়ে গবেষণায় অনেক উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে এবং জনস্বাস্থ্যবাদীরাও এর ক্ষতি সম্পর্কে জনগণকে সতর্ক করেছেন। কিন্তু শব্দদূষণ বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা চালকগণ তার বিন্দুমাত্র কর্ণপাত করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন না। শব্দদূষণকে মারাত্মক জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে, নীতিনির্ধারণী পর্য্যায়ে সঠিক পদক্ষেপ নেয়ার এখনই সময়।