লাকসামে ছয় তলা ভবনকে দেখানো হলো স্থাপনাবিহীন বাড়ি

# ১ কোটি ৫২ লাখ টাকার সম্পত্তির মূল্য দেখানো হয়েছে ৫২ লাখ: তদন্তের নির্দেশ দিলেন সাব-রেজিস্ট্রার
লাকসাম প্রতিনিধি।।
প্রকাশ: ৮ ঘন্টা আগে

কুমিল্লার লাকসামে ছয়তলা পাকা ভবনসহ প্রায় ১ কোটি ৫২ লাখ টাকা মূল্যের সম্পত্তি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে প্রকৃত মূল্য ও স্থাপনার তথ্য গোপন করে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ক্রেতা মকবুল হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগে দলিলে সম্পত্তির প্রকৃত মূল্য উল্লেখ না করা এবং ছয়তলা ভবন থাকা সত্ত্বেও স্থাপনাবিহীন বাড়ি হিসেবে সম্পত্তির বিবরণ দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
চলতি বছরের ৩০ আগস্ট লাকসাম উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে সম্পাদিত ওই দলিলে সম্পত্তির প্রকৃত মূল্য ১ কোটি ৫২ লাখ টাকা হলেও ৫২ লাখ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে বলে অভিযোগে বলা হয়। তবে অভিযোগের সত্যতা ও সরকারের প্রকৃত রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তে নির্ধারিত হবে।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, লাকসাম উপজেলার কান্দিরপাড় ইউনিয়নের তুতিগঙ্গা গ্রামের হাসমত আলীর ছেলে মকবুল হোসেনের কাছে সম্পত্তিটি বিক্রি করেন উম্মে তামান্না। তিনি মনোহরগঞ্জ উপজেলার উত্তরহাওলা গ্রামের মো. রুহুল আমিনের মেয়ে এবং নাঙ্গলকোট উপজেলার আশীরপাড়ের ওয়াহিদ সোহাগ মজুমদারের স্ত্রী।
লাকসাম মৌজার জেএল নম্বর ২০৫-এর ধোপাপুকুর পাড় এলাকায় বিএস খতিয়ান নম্বর ৬৩১ ও ৬৬৭ এবং ৬৮৯ ও ৬৯১ নম্বর দাগে অবস্থিত ২ দশমিক ০৪ শতক জমিসহ ছয়তলা ভবনটি ছাফকবলা দলিলের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়। দলিলটি চলতি বছরের ৩০ আগস্ট লাকসাম উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে নিবন্ধিত হয়।
ভবন আছে অথচ দলিলে স্থাপনাবিহীন বাড়ি:
অভিযোগে বলা হয়েছে, সম্পত্তিটির ওপর নির্মিত ছয়তলা পাকা ভবনটির নির্মাণকাজ ২০২৩ সালে শেষ হয়। অথচ সম্পত্তি হস্তান্তরের সময় নিবন্ধিত দলিলে ভবনটির বিবরণ উল্লেখ না করে স্থাপনাবিহীন বাড়ি হিসেবে দেখানো হয়েছে। একই সঙ্গে সম্পত্তির প্রকৃত মূল্য গোপন করে দলিলে কম মূল্য উল্লেখ করা হয়েছে বলে অভিযোগকারীর দাবি।
অভিযোগকারীর মতে, জমির প্রকৃত শ্রেণি, ভবনের বিবরণ ও সম্পত্তির মূল্য যথাযথভাবে উল্লেখ করা হলে সরকার আরও বেশি রাজস্ব পেতে পারত। এসব তথ্য গোপন করে দলিল সম্পাদন করা হয়ে থাকলে তা সরকারি রাজস্ব আদায়ে অনিয়মের শামিল। তাই সম্পত্তির প্রকৃত শ্রেণি, মূল্য ও স্থাপনার বিবরণ যাচাই করে রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ নির্ধারণ এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে। অভিযোগকারী প্রকৃত তথ্য উদ্ঘাটন, সরকারি রাজস্বের ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।
দায় এড়ালেন না ক্রেতা:
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে দলিলগ্রহীতা মকবুল হোসেন বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসে থাকি। এসব আইনকানুন সম্পর্কে আমি অবগত নই। দলিল লেখক যেভাবে বুঝিয়েছেন, আমি সেভাবেই সম্মতি দিয়েছি। এ ছাড়া আরও দু’জন ক্রেতা রয়েছেন।
দলিল লেখক মো. শফিকুর ইসলাম দাবি করেন, দলিলগ্রহীতা সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেননি; বরং সর্বোচ্চ রাজস্ব পরিশোধ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমার কাজ দলিল করা, তাই করেছি। জায়গায় গিয়ে জমির শ্রেণি যাচাই করা আমার কাজ নয়।
তবে ছয়তলা ভবন থাকা সত্ত্বেও দলিলে স্থাপনাবিহীন বাড়ি উল্লেখ করার অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে দলিল লেখকের দায়িত্ব ও তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
লাকসাম উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ের দলিল লেখক সমিতির সভাপতি মো. আহসান উল্লাহ মজুমদার বলেন, দাতা-গ্রহীতা অর্থাৎ দলিলের পক্ষগুলোর দেওয়া তথ্য ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ভিত্তিতে দলিল লেখক দলিল প্রস্তুত করেন। সাব-রেজিস্ট্রার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করে সঠিক পেলে দলিল নিবন্ধন করেন। তবে পক্ষগুলো কোনো তথ্য গোপন করলে তার দায়ভার তাঁদের ওপর বর্তায়। এ ক্ষেত্রে দলিল লেখকের কিছু করার থাকে না।
তদন্তের নির্দেশ সাব-রেজিস্ট্রারের:
এ বিষয়ে লাকসাম উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার সাজ্জাদুল কবির বলেন, খতিয়ান, নামজারি, জমা-খারিজ ও খাজনার দাখিলাসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে সম্পত্তির শ্রেণি ও অন্যান্য তথ্য সঠিক থাকলে এবং কোনো আপত্তি না থাকলে দলিল নিবন্ধনে বাধা থাকে না। তবে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রকৃত মূল্য বা তথ্য গোপন করা হলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবহিত হয়েছি। এটি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে খতিয়ে দেখা হবে। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট দলিল লেখককে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে এবং প্রকৃত তথ্য ও মূল্য গোপন করে দলিল নিবন্ধন করা হয়ে থাকলে সরকারের প্রাপ্য রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সবকিছুর ঊর্ধ্বে সরকারের স্বার্থ সংরক্ষণ করা আমার দায়িত্ব।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তে সম্পত্তির প্রকৃত মূল্য, ভবনের বিবরণ ও জমির শ্রেণি সম্পর্কে অভিযোগের সত্যতা এবং সরকারের রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারিত হলে এ ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।