মিনিট দশেকের মধ্যেই দৃশ্যপট বদলে গেল । লম্বা, নাদুসনুদুস চেহারার এক ডিআইজি সাহেব ধীর পায়ে এসে একটি কক্ষে বসলেন। তাঁর উপস্থিতির মধ্যেই ছিল এক ধরনের কর্তৃত্বের নীরব ঘোষণা। কিছুক্ষণ পর বেয়ারার মাধ্যমে আমাদের ডাক পাঠানো হলো। আমি ও তরুণ একসঙ্গে উঠে তাঁর সামনে গিয়ে বসলাম ।
তিনি চোখ তুলে প্রথমেই জানতে চাইলেন, শাহাজাদা এমরান কে?
আমি বিনয়ের সঙ্গে বললাম, স্যার, আমি ।
এক মুহূর্ত থেমে তিনি বললেন, আপনাকে নিয়ে আমরা বেশ ঝামেলায় পড়ে গেছি। নীলফামারী পুলিশের তথ্য অনুযায়ী আপনারা নাকি ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ পর্যায়ের কোনো বিশেষ অপরাধী । অথচ বাহিরের দুনিয়ায় দেখি আপনার এত নামডাক! গতকাল রাত থেকে আপনার আইডি, ফেসবুক, লেখালেখি সব ঘেঁটে দেখেছি । কিন্তু নূন্যতম কিছুই পাচ্ছি না। আবার আমাদের তথ্যদাতারা বলছে ভিন্ন কথা ।
কথার ভেতরেই ছিল বিরক্তি যেন আমাকে জিজ্ঞাসাবাদের দায়িত্ব তাঁর কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে জোর করে । তিনি আবার জানতে চাইলেন, বলুন তো, নীলফামারী কেন গিয়েছিলেন?
এই প্রশ্ন আমি গতকাল থেকে কতবার যে উত্তর দিয়েছি, তার হিসাব নেই। সেই একই উত্তর আবারও তাঁকে দিলাম। লক্ষ করলাম, তিনি ঢাকায় আসার আগেই আমার বিষয়ে খোঁজখবর নিয়েছেন। কিছু না পেয়েও তাঁকে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পাঠানো হয়েছে এই বাস্তবতা যেন তাঁকে আরও বিরক্ত করে তুলেছে।
একটু শুনেই বিরক্ত সুরে বললেন,আচ্ছা, বসেন। আরও দুইজন স্যার আসবেন আপনাদের জিজ্ঞাসা করতে । তিনি উঠে চলে গেলেন ।
এই ডিআইজি সাহেবের আচরণেই আমার মনে এক ধরনের স্বস্তি নেমে এলো। মনে হলো, আল্লাহর রহমত এখনো আমার সঙ্গে আছে। মনে মনে ভাবলাম ষড়যন্ত্রকারীরা হয়তো ধীরে ধীরে পরাস্ত হচ্ছে । এরপর এলেন দ্বিতীয় ডিআইজি। প্রবেশ করেই তিনি আমাদের জন্য চায়ের অর্ডার দিলেন। তাঁর আচরণ ছিল আশ্চর্য রকম বন্ধুসুলভ। চা খেতে খেতেই তিনি আমার সাংবাদিকতা জীবনের শুরু থেকে বর্তমান পর্যন্ত সব জানতে চাইলেন। প্রশ্নগুলো ছিল অনুসন্ধানী, কিন্তু শত্রুভাবাপন্ন নয় ।
আমি প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিলাম স্পষ্টভাবে, নির্ভুলভাবে। একপর্যায়ে দৃঢ় কণ্ঠে বললাম,স্যার, যদি আমার বিরুদ্ধে সত্যিকারের তথ্য প্রমাণ থাকে, আমাকে ফাঁসি দিন। কিন্তু যদি কিছু না পান, তাহলে যারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমাকে ফাঁসাতে চেয়েছে, তাদের বিচার আপনারা করবেন তো?
তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনলেন । এরপর আমি বিনয়ের সঙ্গে আরও একটি কথা বললাম।স্যার, আমার একমাত্র ছেলের আগামীকাল এইচএসসি পরীক্ষা। আমরা যদি নির্দোষ হই, তাহলে দয়া করে আমাদের ছেড়ে দিন।
আমি তাঁকে জানালাম, গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখার জন্য কীভাবে আমার কলম ছিল স্পষ্ট ও আপসহীন। আওয়ামী লীগের গুম, খুন ও ভোটবিহীন নির্বাচনের বিরুদ্ধে আমি কীভাবে লিখেছি। বহুবার আমি শিরোনাম দিয়েছি
“বিনা ভোটের উৎসব, কেন্দ্রে ভোটার নেই কুকুর খেলা করে ।” ডিআইজি মহোদয় আমার ফেসবুক ঘেঁটে সেই লেখাগুলোর সত্যতা পেলেন। কিছুক্ষণ নীরবে বসে থেকে তিনি বললেন, আচ্ছা, বসেন। তারপর উঠে চলে গেলেন ।
সবশেষে এলেন ডিআইজি মামুন সাহেব । তিনি একসময় হোমনা থানার ওসি ছিলেন। আমাকে তিনি আগে থেকেই চেনেন। আমাদের হোমনা প্রতিনিধি ও সিনিয়র সাংবাদিক মোর্শেদুল ইসলাম সাজু ভাইয়ের কাছ থেকেও তিনি আমার বিষয়ে বিস্তারিত জেনেছেন ।
রুমে ঢুকেই তিনি বললেন,এমরান ভাই, কোনো চিন্তা করবেন না । আমরা আপনার বিরুদ্ধে কিছুই পাইনি। আমাদের জানার মধ্যেও কিছু নেই। আমাদের দিক থেকে আপনি মুক্ত। এক মুহূর্ত থেমে আবার বললেন,কিন্তু নীলফামারী পুলিশের অনুমতি ছাড়া আমরা আপনাকে ছাড়তে পারব না। আমি জানতে চাইলাম, স্যার, এই মুহূর্তে আইন কী
বলে? তিনি হেসে বললেন, আমাকে স্যার বলবেন না । মামুন ভাই বললেই চলবে । আইনগতভাবে যেহেতু আপনার বিরুদ্ধে আমরা কিছু পাইনি, তাই আমরা কোনো মামলা দিচ্ছি না ।
সাহস সঞ্চয় করে বললাম,মামুন ভাই, নীলফামারীর পুলিশ সুপারকে একটু বলবেন,আমাদের যেন ঢাকাতেই ছেড়ে দেওয়া হয় ।
আমার অনুরোধে তিনি ফোন করলেন। ওপাশ থেকে যিনি আমাদের ফাঁসানোর প্রত্যয় ঘোষণা করেছিলেন, সেই নীলফামারীর পুলিশ সুপার সাফ জানিয়ে দিলেন,ওদের নীলফামারী পাঠান। আইনি প্রক্রিয়া শেষে এখান থেকেই ছাড়ব।
কথাটা শুনে বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল। আবার প্রায় চারশ | কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হবে এই ভাবনাতেই | মনটা ভারী হয়ে গেল ।
শেষ পর্যন্ত পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে আমরা ডিবির ওয়ারী জোন ক্যান্টিনে বসে লাঞ্চ করলাম খাবারের স্বাদ তখন আর জিভে লাগছিল না মাথার ভেতর শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল সত্যের পথ কি এতটাই দীর্ঘ? ২৫ । আবার নীলফামারীর পথে : বিকেল তখন প্রায় তিনটা কিংবা চারটা। ঢাকার ডিবি কার্যালয়ের ওয়ারী জোন থেকে আমাকে ও | তারিকুল ইসলাম তরুণকে নিয়ে আবারও নীলফামারীর উদ্দেশ্যে রওনা হলো পুলিশ । ঢাকায় এসে যে মুক্তির আশার আলোটা ক্ষীণভাবে জ্বলে উঠেছিল, গাড়ি চলতে শুরু করার সঙ্গে সঙ্গেই তা আবার অনিশ্চয়তার অন্ধকারে মিলিয়ে যেতে লাগল ।
এবার দায়িত্বপ্রাপ্ত এসআইকে বিনয়ের সঙ্গেই বললাম,
ভাই, আপনি নিজেই তো বললেন, আমরা মুক্ত নীলফামারী নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেবেন। তাহলে অন্তত বাসায় একটা ফোন করতে দেন প্লিজ আমার ছেলেটা পরীক্ষার্থী। |
উত্তরটা আগের মতোই এখন না। একটু পরে দিচ্ছি।
এই ‘একটু পরে’ যে কত দীর্ঘ, তা বুঝে উঠতে পারছি না গতকাল থেকে।ঢাকা ছাড়ার আগে গাড়ি থামল একটি পেট্রোল পাম্পে। পেট্রোল পাম্পের পাশে থাকা ছোট্ট একটি টং দোকানে গিয়ে দেখি, আমার আবিরের বয়সী এক তরুণ বসে আছে । আমি পুলিশ সদস্যদের জন্য কেক আর কলা কিনছিলাম। সেই ফাঁকে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বললাম, বাবা, বাসায় একটু কথা বলব । এক মিনিট সুযোগ দাও প্লিজ।
ছেলেটি নিঃসংকোচে নিজের ফোনটি আমার হাতে তুলে দিল। বুকের ভেতর তখন একরাশ আশা। কিন্তু নাম্বার ডায়াল করতেই ভেসে উঠল নির্মম বার্তা, “আপনার একাউন্টে পর্যাপ্ত ব্যালেন্স নেই।” মুহূর্তেই মনে হলো, পৃথিবীটা যেন আরও একটু সংকুচিত হয়ে গেল। আর কথা না বাড়িয়ে জীবন বন্ধু জাহেরার উদ্দেশ্যে একটি ছোট্ট এসএমএস লিখলাম, “চিন্তা করোনা । আমরা কাল ফিরছি কুমিল্লা, ইনশাআল্লাহ ।” এটুকু লিখে ছেলেটিকে অনুরোধ করলাম, লক্ষ্মী বাবা, তুমি এই এসএমএসটা পাঠিয়ে দাও ।
ছেলেটি পাঠিয়ে দিল। আমি নাস্তা হাতে নিয়ে আবার গাড়িতে উঠে বসলাম । গাড়ি চলতে শুরু করল ।
ঢাকা শহর পেছনে পড়ে রইল, সামনে শুধু দীর্ঘ পথ আর অজানা পরিণতি
রাত প্রায় দশটার দিকে রংপুর পৌঁছে পুলিশ গাড়ি থামাল নাস্তা করার জন্য । এটাই ছিল আমার আরেকটি সুযোগ। দ্রুত সামনে থাকা একটি বাস কাউন্টারে ঢুকে ম্যানেজারকে বললাম, ভাই, এক মিনিট ফোন করতে দেবেন প্লিজ।
লোকটি বেশ বিরক্ত ভঙ্গিতে একটি বাটন মোবাইল আমার হাতে ধরিয়ে দিল। আমি যেন সময়ের সঙ্গে দৌড়াচ্ছি। দ্রুত নম্বর ডায়াল করলাম
০১৭১৭……।
জাহেরার কণ্ঠ শোনামাত্র বললাম, আমি ভালো আছি। ঢাকা থেকে নীলফামারী যাচ্ছি। এখন রংপুরে আছি। চিন্তা করোনা। আমাদের ছেড়ে দেবে ইনশাআল্লাহ ।
ওপাশ থেকে জানাল, রুবেল (আমার ছোট শ্যালক) ইতিমধ্যে নীলফামারীর উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। আমি বললাম,ওকে বলো পুলিশ সুপারের অফিসের কাছেই থাকতে ।
এই ফোনালাপটি ছিল ২৮ মে শুক্রবার বিকেলে আটকের পর প্রথমবারের মতো বাসার সঙ্গে সরাসরি কথা বলা । তখন সময় শনিবার, ২৯ মে, রাত সাড়ে দশটার কিছু বেশি। বুকের ভেতর জমে থাকা দুশ্চিন্তার ভার খানিকটা লাঘব হলো ।
জীবন বন্ধু জাহেরাকে আরও বললাম, তরুণের পরিবারকেও যেন খবরটা পৌঁছে দেওয়া হয় ।
ফোন রেখে বেরিয়ে এলাম। আবার গাড়িতে উঠলাম। চারপাশে গভীর রাত, নীরব রাস্তা, পুলিশের গাড়ির একঘেয়ে শব্দ। মাথার ভেতর শুধু একটাই প্রার্থনা ঘুরপাক খাচ্ছিল, হে আল্লাহ, সত্যের এই যাত্রার শেষটা যেন অন্ধকার না হয় । চলবে.. ।