শাহাজাদা এমরান রচিত ‘নীলফামারী ও আমার দায়’ খাবারের পর বন্ধুত্বের মুখোশ খুলে গেল : মিথ্যা স্টেটমেন্টের ফাঁদে আটকে আমি

ধারাবাহিক সিরিজ, মূল পাণ্ডুলিপি থেকে-১৬
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ১১ ঘন্টা আগে

সাংবাদিকতার প্রায় তিন দশকের পথচলায় অসংখ্য গল্প শুনেছি। শুনেছি কীভাবে পুলিশ ভয় দেখিয়ে, কীভাবে নিজেদের বাঁচাতে কিংবা দায়িত্বের দায় এড়াতে মিথ্যা, বানোয়াট কল্পকাহিনি সাজায়। এসব শুনেছি মানুষের মুখে, পড়েছি নথিতে, দেখেছি  এবং লিখেছি রিপোর্টে। কিন্তু কখনো ভাবিনি একদিন নিজের চোখে দেখব, নিজের শরীর দিয়ে অনুভব করব সেই নির্মম বাস্তবতা। সেই দিন, সেই রাত আমাকে সেই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল।খাবার শেষ হওয়ার পর ডিবির এসআই জাকির যে কিছুক্ষণ আগেও বন্ধুর মতো আচরণ করছিল হঠাৎ করেই যেন আরেক মানুষ হয়ে গেল। বন্ধুত্বের মুখোশ খুলে গেল। সে আমাকে আলাদা একটি রুমে নিয়ে গেল। হাতে হাত রেখে, কণ্ঠে কৃত্রিম স্নেহ মিশিয়ে বলল, দোস্ত, একটা উপকার করতে হবে।

আমি শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলাম, কী উপকার?

সে বলল,দেখ, মিস ইনফরমেশনের কারণে তোমাকে হয়রানি করা হয়েছে। যেটা হওয়ার, সেটা তো হয়ে গেছে। এখন তো তোমাকে সম্মানজনকভাবেই ছাড়তে হবে। কিন্তু সেটা আমাদের করতে হবে আইনের ভেতর থেকে।

তার কথা শুনে বুঝলাম এখানে আইনের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে নিজেদের বাঁচানোর তাগিদ।

সে আবার বলল,

এখন আমরা যদি তোমাকে এভাবে ছেড়ে দিই, আর তুমি যদি বাইরে গিয়ে বলো যে তোমাকে হোটেল থেকে তুলে আনা হয়েছে, তাহলে আমাদের বড় সমস্যা হবে। তাই তোমাকে একটু সহযোগিতা করতে হবে।

‘সহযোগিতা’ শব্দটি শুনেই আমার বুকের ভেতর কেমন করে উঠল। কী ধরনের সহযোগিতা তা বুঝতে বাকি রইল না।

আমি জানতে চাইলাম,কী সহযোগিতা?

সে নির্লজ্জ ভঙ্গিতে জানাল,

সব আমরা লিখে ফেলেছি। তুমি আর তরুণ শুধু স্বাক্ষর করবে। আমরা লিখেছি তুমি আর তরুণ নীলফামারী সীমান্ত এলাকায় ঘোরাঘুরি করছিলে। সন্দেহজনক মনে হওয়ায় আমরা তোমাদের আটক করি। পরে তদন্তে তোমরা নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ায়, তোমার স্ত্রীর করা কুমিল্লা কোতোয়ালি থানার জিডির আলোকে তোমাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। এইটুকু স্যাক্রিফাইস তোমাকে আমাদের জন্য করতে হবে।

তার কথা শুনে মুহূর্তের মধ্যে মাথার ভেতর ঝড় বয়ে গেল। এত বড়, এত নির্লজ্জ মিথ্যা স্বীকারোক্তি আমি দেব?

আমি প্রতিবাদ করে বললাম,এত বড় মিথ্যা স্বাক্ষরোক্তি আমি দেব কীভাবে?

তখন এসআই জাকির ঠান্ডা গলায় বলল,এ ছাড়া আর কোনো আইনি পথ খুঁজে পাচ্ছি না। আমরা তোমাকে আটক করে নিজেরাই ঠেকে গেছি। এখন তুমি কুমিল্লায় গিয়ে আমাদের উদ্ধার কর।

এই কথাটার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের এক ভয়াবহ স্বীকারোক্তি আইনের নয়, মানুষের নয়; কেবল নিজেদের বাঁচানোর লড়াই।

আমার চোখের সামনে তখন শুধু কুমিল্লা।

কুমিল্লা আমার শহর। কুমিল্লা আমার প্রাণের স্পন্দন।

কুমিল্লার আলো, বাতাস, মাটির গন্ধ নেওয়ার জন্য আমি তখন উন্মুখ। মনে হচ্ছিল এই মুহূর্তে যদি কেউ বলে, আরও বড় কোনো অপরাধ স্বীকার করলেই মুক্তি, তবুও হয়তো রাজি হয়ে যাব। কারণ আমার আর কোনো শক্তি অবশিষ্ট নেই। শুধু একটাই আকাঙ্ক্ষা ফিরে যেতে চাই। প্রাণের শহরে ফিরতে চাই।

অনেক ভেতরের দ্বন্দ্ব, আত্মগ্লানি আর অসহায়তার পর বললাম, দাও কাগজ। স্বাক্ষর করি।

এরপর পাশের রুম থেকে তরুণকে ডেকে আনা হলো। তাকেও একইভাবে বোঝানো হলো। আমরা দু’জন মিথ্যা, বানোয়াট, পুলিশের তৈরি এক কল্পকাহিনীতে স্বাক্ষর করে দিলাম। এমন এক কাগজে, যার প্রতিটি লাইনে সত্যকে হত্যা করা হয়েছে।

আমাকে আনতে যাওয়া আমার দুই স্বজনকেও সেখানে স্বাক্ষী বানানো হলো। তারাও স্বাক্ষর করল না চেয়ে ও না বুঝে।

সেদিন বুঝলাম কাগজে কলমের এক ফোঁটা কালিই কখনো কখনো মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় মিথ্যা হয়ে ওঠে। আর সেই মিথ্যার ভার বইতে হয় নিরপরাধ মানুষের কাঁধে।

বন্ধু জাকির তখন আর বন্ধু ছিল না। সে ছিল আইনের পোশাক পরা এক অসহায় পুলিশ, যে নিজের বাঁচার জন্য আমাকে ঠেলে দিয়েছিল মিথ্যার খাতায়।

আবার সেই ক্ষমতার মুখোমুখি : বদলে যাওয়া মুখ, বদলায়নি মন

নীলফামারী ডিবি কর্তৃক প্রস্তুত করা কাগজে স্বাক্ষর দেওয়ার পর এসআই জাকির এসে বলল, দোস্ত, এসপি স্যার রুমে অপেক্ষা করছেন। একবার দেখা করে যাও। মন সায় দিচ্ছিল না। তবুও রাজি হলাম। অনিচ্ছা সত্ত্বেও দাঁড়াতে হলো সেই মানুষটির সামনে , যিনি আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে, কেবল ব্যক্তিগত জেদ আর অহংকারের বশবর্তী হয়ে টানা তেত্রিশ ঘণ্টা আমাদের শ্বাসরুদ্ধকর এক বন্দিত্বে রেখেছিলেন। তিনি শুধু আমাদের হয়রানি করেননি; আমার জীবনের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিলেন এক আজীবন দায় , এক কলঙ্কের ছায়া, যার দায় বহন করতে হতো নিঃশব্দে।

এর আগের দিন, হাতকড়া পরা অবস্থায় তার কক্ষে প্রবেশ করতেই তিনি উন্মত্ত হয়ে উঠেছিলেন। আওয়ামী লীগের দোসর আখ্যা দিয়ে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেছিলেন। আমাকে ফাঁসাতে সহকর্মী তরুণকে মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে প্ররোচিত করেছিলেন। একটি নামকাওয়াস্তে মামলা দাঁড় করানোর জন্য এমন কোনো কূটকৌশল নেই যা তিনি প্রয়োগ করেননি।

আজ সেই একই মানুষ এক অদ্ভুত রূপান্তরে পুরো একশ আশি ডিগ্রি ঘুরে গেলেন। নিজেই চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বসতে অনুরোধ করলেন। মুখে কৃত্রিম হাসি, কণ্ঠে সৌজন্যের আবরণ। শুরু হলো তথাকথিত খোশগল্প।

বললেন,শুধু বিএনপি করার কারণেই গত সতেরো বছর আমাকে প্রমোশন দেওয়া হয়নি।

বুকের ভেতর জমে থাকা সাহস একবারে বের করে এনে বিনয়ের আড়ালে বললাম, স্যার, তাহলে কি আপনি আমাকে বড় ফ্যাসিস্টদের দোসর বানিয়ে আপনার চাকরির প্রমোশন নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন?

এই কথাটি পছন্দ হয়নি সাধারণ মানুষকে হয়রানি করার জন্য নোবেল পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য সেই পুলিশ সুপারের। সুঠাম দেহের অধিকারী, পরিপাটি পোশাকের আড়ালে থাকা তার মুখ মুহূর্তেই কালো হয়ে গেল। তিনি আর সে পথে এগোলেন না। কথার মোড় ঘুরিয়ে বললেন, কুমিল্লা থেকে আপনার পক্ষে যত সুপারিশ এসেছে, তার চেয়েও বেশি এসেছে বিপক্ষে।

আমি আবারও শান্ত কণ্ঠে বললাম, তাহলে যারা আমার বিপক্ষে বলেছে, এখন তাদের ধরুন স্যার। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিন। এবারও উত্তর এলো না। যুক্তিতে পেরে না উঠে তিনি আবার কথার মোড় ঘুরিয়ে নিলেন। বুঝে গেলাম, এটি ছিল এক দীর্ঘ ক্ষমতার নাটক, যেখানে সত্যের কোনো জায়গা নেই, যুক্তির কোনো মূল্য নেই। এখানে কেবল জয়ী হয় ক্ষমতা, আর পরাজিত হয় মানুষ।

আমি চুপ করে রইলাম। কারণ, তখন বুঝে গেছি, এই মুখোমুখি হওয়াটা আসলে ন্যায়বিচারের নয় , এটা কেবল ক্ষমতার আত্মতৃপ্তির শেষ দৃশ্য।