শাহাজাদা এমরান রচিত ‘নীলফামারী ও আমার দায়’ টিকিট কাটলাম পঞ্চগড়ের, আর নামতে হলো নীলফামারীতে :

ধারাবাহিক সিরিজ, মূল পাণ্ডুলিপি থেকে-২
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ৪ ঘন্টা আগে

২৭ জুন ২০২৫, শুক্রবার। সকাল ঠিক ১০টা ২ মিনিটে তয়েজ এন্টারপ্রাইজের বাসটি যখন নীলফামারীতে এসে থামল, তখনো আমার বিশ্বাস ছিল এটি সাময়িক বিরতি। একটু পরেই আবার চলবে, গন্তব্য পঞ্চগড়। কিন্তু বাসের ভেতরের দৃশ্য আর চালক কন্ট্রাক্টরের কথাবার্তা খুব দ্রুত সেই বিশ্বাস ভেঙে দিল।
যাত্রী নেই এই অজুহাতে কন্ট্রাক্টর চালকের সঙ্গে দর-কষাকষি শুরু করল। কথার ভঙ্গিতেই বোঝা যাচ্ছিল, পঞ্চগড় পর্যন্ত যাওয়ার কোনো ইচ্ছাই তাদের নেই। কিছুক্ষণ পর সিদ্ধান্তটা একেবারেই চূড়ান্ত হয়ে গেল। বাসটি আর পঞ্চগড় যাবে না। আমাদের যাত্রা এখানেই শেষ। বুঝে গিয়েছি, টিকিট কেটেছি পঞ্চগড়ের, অথচ নামতে হবে নীলফামারীতে।
এই অপ্রত্যাশিত বাস্তবতায় বুকের ভেতর হালকা একটা ধাক্কা লাগল। দীর্ঘদিনের স্বপ্ন, রাতভর জার্নি, মানসিক প্রস্তুতি সবকিছু যেন মুহূর্তের মধ্যে অনিশ্চয়তায় ঢেকে গেল। মনের ভেতরের সেই কষ্ট আর ক্ষোভ চেপে রাখতে না পেরে সঙ্গে সঙ্গেই ফেসবুকে আমার ওয়ালে একটি পোস্ট দিলাম-
“টিকিট কাটলাম পঞ্চগড়ের।গাড়ির চালক নীলফামারী নামিয়ে দিয়ে বলল, ‘আপনাদের ছাড়া পঞ্চগড়ের আর কোনো যাত্রী নেই।
গরিবের পেটে লাথি দিয়েন না স্যার, নামেন।’ ২৭.০৬.২০২৫”। পোস্টটি ছিল কেবল ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়; ছিল এক ধরনের প্রতিবাদ, ছিল যাত্রাপথে প্রান্তিক মানুষের অসহায় বাস্তবতার নীরব দলিল।
আমরা যখন বাস থেকে নামব সেই মুহূর্তে ফোন বেজে উঠল।
ফোনের ওপাশে কানাডা থেকে ‘ফেস দ্য পিপল’-এর পরিচালক, দেশখ্যাত সাহসী সাংবাদিক সাইফুর রহমান সাগর ভাই। তিনি জানালেন, ২ জুলাই দেশে ফিরছেন। এই খবরে দু’চারটা কথা হলো। সাগর ভাইয়ের সঙ্গে কথোপকথনটা যেন এই অপ্রত্যাশিত ধাক্কার ভেতর এক চিলতে স্বস্তি এনে দিল।
ফোন শেষ করে আমরা নীলফামারী পৌর চত্বরে নামলাম। আশপাশে তাকিয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম,এখানে কিছু সময় কাটাতে হবে। বিকেলের মধ্যেই কুমিল্লা ফেরার পরিকল্পনা। তাই দীর্ঘ অবস্থানের সুযোগ নেই। কাছেই নূর রেস্ট হাউজ নামে একটি আবাসিক হোটেল পেলাম। এক বেলার জন্য একটি সিঙ্গেল রুম ভাড়া নিলাম। সাময়িক আশ্রয়, একটু বিশ্রামের জন্য।

রুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে নিচে নামলাম। হোটেলের রেস্টুরেন্টে সাদামাটা খাবার খেলাম। কিন্তু মাথার ভেতরে একটাই চিন্তা ঘুরছিল,সময় নষ্ট করা যাবে না। আমরা এখানে থামিনি থাকার জন্য, থেমেছি পরিস্থিতির চাপে।
আমি সহকর্মী তরিকুল ইসলাম তরুণকে বললাম,“আমরা থাকব না। যতটুকু সময় আছে, নীলফামারীটা দেখে নিই।” কোথায় যাওয়া যায় এই প্রশ্নে হোটেলের ম্যানেজারের দিকে তাকাতেই তিনি বললেন, “আপনারা নীলসাগর যেতে পারেন। এটা নীলফামারীর অন্যতম ঐতিহ্যবাহী জায়গা।” ‘নীলসাগর’ নামটাই কেমন যেন আলাদা করে ডাক দিল। মনে হলো, পঞ্চগড় না হলেও নীলফামারী বুঝি নিজেই আমাদের পথ রুদ্ধ করে ধরে রেখেছে। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম যেখানে নামতে বাধ্য হয়েছি, সেখানকার গল্প অন্তত শুনে যাব।শুনাব কুমিল্লার জমিন এর দর্শকদের।
সেই মুহূর্তেও বুঝিনি এই নীলফামারীতেই আমার জন্য অপেক্ষা করছে এক শ্বাসরুদ্ধকর অভিজ্ঞতা, যা পরে “নীলফামারী ও আমার দায়” নামের একটি বইয়ের জন্ম দেবে।
নীলসাগর : ইতিহাসের নীল জলরেখা ও বর্তমানের জীবন্ত কাব্য
নীলসাগরের পাড়ে দাঁড়িয়ে আমাদের বেদনার নীল কাব্যটি বিধৃত করার আগে, প্রিয় পাঠকদের কাছে এই ঐতিহাসিক জলাশয়টির একটি বিস্তৃত পরিচয় দেওয়া জরুরি বলে মনে করি। কারণ নীলসাগর শুধু একটি দিঘি নয়,এটি ইতিহাস, প্রকৃতি, লোকসংস্কৃতি ও মানুষের বিশ্বাসের এক জীবন্ত সমন্বয়।
নীলফামারী জেলার সদর উপজেলার গোড়গ্রাম ইউনিয়নে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক দিঘিটির নাম নীলসাগর। জেলা সদর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১৪ কিলোমিটার। বিস্তৃত জলরাশি আর সবুজ ঘেরা পাড় মিলিয়ে দূর থেকেই নীলসাগর যেন এক শান্ত নীল স্বপ্নের মতো ভেসে ওঠে।
ইতিহাসের পাতা উল্টে জানা যায়, অষ্টম শতাব্দীতে বৈদিক রাজা বিরাট এই দিঘিটি খনন করেন বলে ধারণা করা হয়। তাঁর নামানুসারেই একসময় এই জলাশয়টি পরিচিত ছিল বিরাট দিঘি নামে। সময়ের প্রবাহে নামেরও পরিবর্তন ঘটে । লোকমুখে এটি বিন্না দিঘি নামে পরিচিতি পায়। অবশেষে ১৯৭৯ সালে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে এই ঐতিহাসিক দিঘিটির নামকরণ করা হয় নীলসাগর। নামের এই পরিবর্তনের মধ্যেও যেন ইতিহাসের দীর্ঘ পথচলার একটি নীরব সাক্ষ্য লুকিয়ে আছে।
নীলসাগরের মোট জমির পরিমাণ প্রায় ৫৩.৯০ একর। এর মধ্যে জলভাগের আয়তন ৩২.৭০ একর, আর দিঘির চারপাশের পাড় ও স্থলভাগ জুড়ে আছে প্রায় ২১ একর জমি। বিশাল এই জলরাশি শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার নয়, বরং এটি একটি ঐতিহাসিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়স্থল।
বর্তমানে নীলসাগরকে ভ্রমণপিপাসু মানুষের জন্য আরও আকর্ষণীয় ও উপভোগ্য করে তুলতে বিভিন্ন সংস্কার ও উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। দিঘির সৌন্দর্য রক্ষার পাশাপাশি এখানে নির্মাণ করা হয়েছে একটি রেস্ট হাউস, দৃষ্টিনন্দন প্রবেশ তোরণ এবং একটি মসজিদ। দিঘির পাড় জুড়ে লাগানো হয়েছে বনবাবুল, নারকেল, মেহগনি, শিশু, আকাশমণিসহ নানা জাতের ফল ও ফুলের গাছ যেগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নীলসাগরের সৌন্দর্যকে আরও ঘন ও গভীর করে তুলেছে।
প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে নীলসাগরের আরেকটি বড় আকর্ষণ হলো এর পাখিজগৎ। শীত এলেই দূর-দূরান্ত থেকে অসংখ্য অতিথি পাখি এসে আশ্রয় নেয় এই নীল জলের কোলে। পাখিদের অবাধ বিচরণ ও নিরাপদ আবাস নিশ্চিত করতে ১৯৯৮ সালে নীলসাগরকে আনুষ্ঠানিকভাবে পাখির অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়। তখন নীলসাগর যেন শুধু জলাশয় নয়, হয়ে ওঠে এক নীরব অথচ প্রাণবন্ত পাখির রাজ্য।
লোকসংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্যেও নীলসাগরের ভূমিকা অনস্বীকার্য। প্রতি বছর চৈত্রসংক্রান্তিতে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষজন এখানে আয়োজন করে বারুণী স্নান উৎসব। সেই সময় নীলসাগরের পাড়ে মানুষের ঢল নামে। ধর্মীয় আচার, উৎসব আর লোকজ আনন্দে পুরো এলাকা মুখর হয়ে ওঠে। দিঘির পূর্ব পাড়ে রয়েছে একটি মন্দির, আর পশ্চিম পাড়ে আছে দরবেশের আস্তানা। প্রায় প্রতিদিনই সেখানে বসে দেহতত্ত্ব গানের আসর। লোকজ সুরে, ভাববাদী কথায় জীবনের গভীর দর্শন যেন ভেসে ওঠে।
চৈত্র মাসের পূর্ণিমায় নীলসাগরের পাড়ে বসে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী মেলা। নাগরদোলা, মাটির খেলনা, লোকজ খাবার আর মানুষের মিলনমেলায় তখন নীলসাগর হয়ে ওঠে এক আনন্দঘন জনপদের কেন্দ্রবিন্দু।
প্রশাসনিক দিক থেকেও নীলসাগর একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। এটি সরাসরি নীলফামারী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। চারজন স্টাফের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি প্রতি মাসে প্রায় ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা সরকারি রাজস্ব আদায় হয় এই নীলসাগর থেকে। অর্থাৎ ইতিহাস ও সৌন্দর্যের পাশাপাশি এটি রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিতেও একটি ইতিবাচক অবদান রেখে চলেছে।
নীলসাগর তাই শুধু একটি দিঘি নয়—এটি ইতিহাসের নীল জলরেখা, সংস্কৃতির প্রবাহমান ধারা এবং বর্তমানের এক জীবন্ত কাব্য। এই নীল জলের পাড়ে দাঁড়িয়ে আমাদের ব্যক্তিগত যাত্রা ও দায়বদ্ধতার গল্প যেন আরও গভীর অর্থ খুঁজে পায়। চলবে